কখনো হারাবে না হলুদ-লাল প্রজাপতির সেই দিনগুলো
সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যখন আমার পরিচয়, তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, সবে কৈশোরে পা দিয়েছি। একদিন বড় বোন ঘরে নিয়ে এলো ‘তিন গোয়েন্দা: কাকাতুয়া রহস্য’। সত্যি বলতে প্রথমে বইয়ের আকার ও মলাট দেখে ভালো লাগেনি। এর আগে স্কুলে বন্ধুদের দেখতাম খুব আগ্রহ নিয়ে এই মলাটের বই পড়ছে। তখনো বুঝে উঠিনি যে, তিন গোয়েন্দা আমাকেও কতটা আসক্ত করে ফেলবে!
সেই যে শুরু, এরপর স্কুলব্যাগের ভেতর বাংলা ব্যাকরণ আর গণিতের খাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকত এই তিন গোয়েন্দার রহস্য। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা গ্রীষ্ম বা ঈদের বন্ধে, যখন বিনোদনের জগত বলতে ছিল সনি টিভি আর বই পড়া, যখন মুঠোফোন আর ইন্টারনেট ছিল না, তখন বই পড়ার একটা চল ছিল। আমরা আসলে সেই সময়কার মানুষ! পাঠ্য বইয়ের ভাঁজে রেখে কিংবা বিদ্যুৎ চলে গেলে টর্চের আলোয় কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ডের সঙ্গে আমিও যেন রকি বিচে ঘুরে বেড়াতাম!
আমি নিজেই যে ছিলাম তখন কিশোর বয়সে। নানা মানসিক পরিবর্তনে বাইরের জগতের সঙ্গে হাতছানি হতো বইয়ের মাধ্যমেই। সত্যি বলতে, একদিন ‘বিদেশে’ পড়তে যাব, রকি বিচের মতোন নানা জায়গা ঘুরে দেখব—এই স্বপ্নগুলো তৈরিতে বইয়ের একটা প্রভাব আছে। অন্তত আমাদের মতো নব্বই দশকের প্রজন্মের। মনে হতো, পশ্চিমের কিশোরেরা কত স্বাধীন! কত অপার সম্ভাবনা সেখানে রয়েছে!
সেবা প্রকাশনীর সূচনা
বাংলাদেশের জনপ্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেবা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ সালে। লক্ষ্য ছিল সহজ ভাষায়, সুলভ মূল্যে ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় বইকে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ইতিহাস লিখতে গেলে সেবা প্রকাশনীর নাম এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। মূলত লেখক ও প্রকাশক কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরেই এর শুরু। তিনি ঢাকার সেগুনবাগিচায় এই প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলা পেপারব্যাক সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাদেরই ভূমিকা ছিল অসাধারণ। কিশোরদের জন্য সুলভ মূল্যে রোমাঞ্চ, রহস্য, গোয়েন্দা কাহিনি ও বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ পৌঁছে দিয়েছিল এই সেবা প্রকাশনী। অনেক সুলভ মূল্যেই এই বইগুলো আমি কিনেছি টিফিন খরচ জমিয়ে। আর নীলক্ষেতে তো পুরোনো বইও পাওয়া যেত!
সেবা প্রকাশনীর প্রথম দিকের সফল সিরিজ ছিল ‘কুয়াশা’। আর এই প্রকাশনীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল লেখক রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা। মূলত ‘দ্য থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ সিরিজ অবলম্বনে রচিত হলেও কিশোর, মুসা ও রবিন বাংলাদেশের পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছিল একেবারেই নিজেদের চরিত্র। বুদ্ধিদীপ্ত, কোঁকড়া চুল আর উজ্জ্বল কালো চোখের কিশোর পাশা তো বাংলাদেশি এক কিশোর। গল্পের এই মূল চরিত্রের সঙ্গে ভোজনরসিক মুসা আর আরেক বুদ্ধিদীপ্ত রবিন হয়ে উঠেছিল খুব চেনা চরিত্র।
এই তিন মূল চরিত্রের সঙ্গে আরও বেশ কিছু চরিত্র আমাদের আপন হয়ে উঠেছিল—মেরি চাচি, রগচটা জিনা, কিশোরের কুকুরটা, এমনকি পাশা ব্যাকইয়ার্ড। মনে পরে রোলস রয়েসের সেই দামি গাড়িটার কথাও! আমরা বেশিরভাগ সময়েই নিজেরা কল্পনার জগতে চরিত্রগুলো তৈরি করে নিতাম, যেমন কিশোর দেখতে ঠিক এমনটাই। আমার মনে হয়, তিন গোয়েন্দা যদি এ সময়ের হতো, হয়তো এই বই নিয়ে নাটক কিংবা সিরিজ হতো। আমরা হয়তো পর্দায় আমাদের এই চরিত্রগুলোকে দেখতে পেতাম।
সেবা প্রকাশনীর আরেক কিংবদন্তি সৃষ্টি মাসুদ রানা। ১৯৬৬ সালে কাজী আনোয়ার হোসেন এই স্পাই-থ্রিলার সিরিজ শুরু করেন। তিনি নিজেই এই চরিত্র সৃষ্টি করেন। জেমস বন্ডের ছায়া থাকলেও সময়ের সঙ্গে মাসুদ রানা হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব এক অ্যাকশন-নায়ক, যার শত শত বই প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককে মুগ্ধ করেছে। মাসুদ রানা আর তিন গোয়েন্দা দুটোই গোয়েন্দা কল্পকাহিনী হলেও দুটোর মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য ছিল। পাঠকেরা নিশ্চয়ই জানবেন এই পার্থক্যগুলো কী। যেমন: তিন গোয়েন্দা একেবারেই কিশোরদের জন্য। সেই তুলনায় মাসুদ রানা যুবক, অ্যাকশনকেন্দ্রিক।
শুধু রহস্য বা থ্রিলার নয়, সেবা প্রকাশনী বিশ্বসাহিত্যকেও নিয়ে এসেছিল বাংলা ভাষায়। অনেকের জন্য বিশ্বসাহিত্যের প্রথম দরজা খুলেছিল সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ বই। কিশোর ক্লাসিক সিরিজের মাধ্যমে জুল ভার্ন, মার্ক টোয়েন, চার্লস ডিকেন্স, আলেকজান্দ্র দ্যুমা, আর্থার কোনান ডয়েলসহ বিশ্বসাহিত্যের বহু বিখ্যাত লেখকের কাজ প্রথমবারের মতো অসংখ্য বাংলাদেশি কিশোরের হাতে পৌঁছায়।
পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন বা পশ্চিমা সিরিজে ওয়াইল্ড ওয়েস্টের গল্প, কিশোর ক্লাসিক সিরিজে বিশ্বখ্যাত উপন্যাস, রহস্য পত্রিকা, কুয়াশা, অনুবাদকৃত ভৌতিক গল্প, বিজ্ঞানভিত্তিক বই, সব মিলিয়ে সেবা ছিল কিশোরদের জন্য এক বিশাল পাঠজগৎ! আফসোস হয়, এখনকার এত আধুনিক যুগে এমন কোনো প্রকাশনী আর চোখে পড়ে না! পাঠকদেরও কারো যেন কোনো আগ্রহও নেই।
আজকের কিশোরেরা হয়তো স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বড় হচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে সেই পাতলা নিউজপ্রিন্টের বই হাতে নিয়ে। সেগুনবাগিচার ছোট্ট প্রকাশনী থেকে বের হওয়া বইগুলো শুধু গল্প দেয়নি, শিখিয়েছে কল্পনা করতে, বইয়ের প্রেমে পড়তে। দুঃখের বিষয়, ২০২৬ সালে নানান অনিয়ম ও নিরীক্ষাজনিত কারণে সেবা প্রকাশনী তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এতে আহত হয়েছি আমরা অনেকেই। যারা হয়তো কলেজ শেষে তিন গোয়েন্দা পড়ব ভেবেও আর পড়িনি। বুঝতে পারিনি, কবে হুট করে কিশোর পাশা, মুসা আমানকে পড়ার বয়সটা শেষ হয়ে গেছে।
সেবা প্রকাশনী কি সত্যিই বন্ধ হয়ে যেতে পারে? হয়তো প্রতিষ্ঠান থেমে যেতে পারে, কিন্তু কিশোর পাশার রহস্যভেদ, মাসুদ রানার দুঃসাহসিক অভিযান কিংবা পুরোনো বইয়ের পাতায় জমে থাকা সেই কাগজের গন্ধ—এসব তো কোনোদিন হারিয়ে যাবে না। আমার নিজেরই বইয়ের শেলফে, স্মৃতিতে আর নিজের সেই সীমিত কিন্তু বিস্তৃত কৈশোরের সবচেয়ে প্রিয় সময়গুলোতে সেবা প্রকাশনী আজও বেঁচে আছে। বইমেলায় নতুন বইয়ের অপেক্ষা, পুরোনো বইয়ের দোকানে হারিয়ে যাওয়া সংখ্যা খোঁজা, বন্ধুদের সঙ্গে বই বিনিময় করা—এসব ছিল একসময়কার মধ্যবিত্ত বাঙালি কৈশোরের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।


