অতিথি এলে চা-বিস্কুটের সংস্কৃতি কি এখনো আছে?
একসময় অতিথি আপ্যায়ন মানেই ছিল এক কাপ গরম চা, সঙ্গে বিস্কুট। বাড়িতে কেউ এসেছেন আর চা দেওয়া হয়নি, এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যেত না। আত্মীয়, প্রতিবেশী, বাবার বন্ধু, মায়ের সহকর্মী কিংবা দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয় যেই আসুক না কেন, একই প্রশ্ন শোনা যেত, ‘চা দেবো?’
অনেকের শৈশবের স্মৃতিতে এই দৃশ্য এখনো স্পষ্ট। ড্রয়িংরুমে বড়রা গল্প করছেন, আর রান্নাঘরে চায়ের পানি চড়েছে। কিছুক্ষণ পর ট্রেতে করে চায়ের কাপের সঙ্গে কয়েকটি বিস্কুট চলে এসেছে। অনেক সময় সেই বিস্কুটের কৌটা বিশেষ অতিথিদের জন্য তোলা থাকত। শিশুদের কাছে সেটি ছিল আলাদা আকর্ষণের বিষয়। বড়রা গল্প করছেন, আর সুযোগ বুঝে কেউ একজন বিস্কুটের কৌটা থেকে বাড়তি একটি বিস্কুট নিয়ে নিচ্ছে, এমন স্মৃতি অনেকের কাছেই পরিচিত।
তখন অতিথি আসাও ছিল অন্য রকম। এখনকার মতো আগে থেকে ফোন করে সময় নেওয়ার বিষয় ছিল না। অতিথি হঠাৎ করেই চলে আসতেন। বিকেলে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে বোঝা যেত, কেউ এসেছেন। কখনো মামা, কখনো খালা, কখনো দূরের কোনো আত্মীয়। তাদের সঙ্গে আসত গল্প, খবর আর দীর্ঘ আড্ডা। আর সেই আড্ডার নীরব সঙ্গী ছিল চা-বিস্কুট।
মফস্বলে এই সংস্কৃতি আরও বেশি চোখে পড়ত। বাড়িতে অতিথি এলে সঙ্গে সঙ্গে চুলায় পানি বসানো হতো। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উঠানে, বারান্দায় বা ঘরের মেঝেতে বসে চলত গল্প। অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন হয়তো খুব বড় ছিল না, কিন্তু আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি থাকত না।
সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। এখন মানুষ আগের চেয়ে বেশি ব্যস্ত। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগও কমে গেছে। অনেক সম্পর্কই এখন ফোন, মেসেজ বা ভিডিও কলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কেউ বাসায় এলেও অনেক সময় বাইরে থেকে খাবার আনা হয় কিংবা ক্যাফেতে দেখা করার পরিকল্পনা করা হয়।
খাবারের অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে বিস্কুট প্রায় সব বাড়িতেই নিয়মিত থাকত, এখন তার জায়গায় দেখা যায় নানা ধরনের নাশতা। কেউ কেক পরিবেশন করেন, কেউ চানাচুর, কেউ আবার বাইরে থেকে কিছু এনে রাখেন। অনেক ক্ষেত্রে চায়ের পাশাপাশি কফি, ফলের রস বা অন্য পানীয়ও পরিবেশন করা হয়। বিশেষ করে বাসায় তরুণদের আড্ডায় চায়ের একচ্ছত্র উপস্থিতি আগের মতো নেই।
তবে পরিবর্তন এলেও চা-বিস্কুট পুরোপুরি জায়গা হারায়নি। এখনো দেশের অসংখ্য বাড়িতে অতিথি এলেই চায়ের কেটলি চুলায় ওঠে। অনেক গ্রামে, ছোট শহরে কিংবা ঢাকারও কিছু পরিবারে এই দৃশ্য এখনো প্রায় আগের মতোই দেখা যায়। এমনকি অফিসে, দোকানে বা কর্মক্ষেত্রেও অতিথি এলে এক কাপ চা দেওয়াকে এখনো ভদ্রতা ও আন্তরিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
আসলে চা-বিস্কুট কখনো শুধু খাবার ছিল না, ছিল মানুষের সঙ্গে বসার একটি উপলক্ষ। এক কাপ চায়ের অজুহাতে গল্প শুরু হতো, সম্পর্ক গাঢ় হতো, খবর আদান-প্রদান হতো। বিস্কুটের দাম বা মান গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; গুরুত্বপূর্ণ ছিল একসঙ্গে কিছু সময় কাটানো।
আজকের দিনে হয়তো অতিথির সামনে শুধু বিস্কুট নয়, কফি, কেক বা আরও অনেক কিছু রাখা হয়। তবু অনেক বাড়িতে অতিথি এলেই প্রথম প্রশ্নটি এখনো একই থাকে—‘চা খাবেন?’। সেই প্রশ্নের মধ্যেই যেন টিকে আছে বহু বছরের একটি সংস্কৃতি।
তাই চা-বিস্কুটের সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে—এ কথা বলা কঠিন। বরং বলা যায়, সময়ের সঙ্গে এর রূপ বদলেছে। কিন্তু অতিথিকে এক কাপ চা দিয়ে বসতে বলার যে আন্তরিকতা, সেটি এখনো বাংলাদেশি আতিথেয়তার একটি পরিচিত অংশ হয়ে আছে।


