ইফতার: বন্ধুত্ব, আড্ডা ও শহুরে সংস্কৃতি

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

রমজান মানে শুধুই রোজা রাখা নয়। রমজান মানে অপেক্ষা। বিকেলের দিকে আকাশের রঙ বদলানো। রাস্তায় হালকা ব্যস্ততা। আর মাগরিবের আজানের আগে সেই চিরচেনা মুহূর্ত—ইফতার আড্ডা।

ঢাকা শহরে রমজান এলে সময় যেন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। দুপুরের ক্লান্তি পেরিয়ে বিকেলে শহর জেগে ওঠে নতুন ছন্দে। অফিসফেরত মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী—সবাই যেন একই দিকে ছুটে চলে। গন্তব্য? একটা টেবিল। কয়েকটা চেয়ার। সামনে সাজানো খেজুর, বুট, পেঁয়াজু, হালিম। আর তার সঙ্গে একরাশ গল্প।

ইফতার আড্ডা আসলে শুধু খাওয়া নয়, এটা সম্পর্কের পুনর্মিলন।

বন্ধুত্বের টেবিল

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা সারা বছরই ব্যস্ত থাকে। কেউ টিউশনি করে, কেউ চাকরি খোঁজে, কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে। কিন্তু রমজানে একটা দিন ঠিক করে সবাই মিলে ইফতার করার পরিকল্পনা হয়। অনেক সময় জায়গা ঠিক হয় পুরান ঢাকার কোনো রেস্টুরেন্টে। কখনো ধানমন্ডির ছাদে। কখনো আবার বাসার ডাইনিং টেবিলেই।

খাবারের আগে গল্প শুরু হয়—কে কোথায় ইন্টার্নশিপ পেল, কার রেজাল্ট কেমন হলো, কে কাকে পছন্দ করে। পুরোনো স্মৃতি টেনে আনা হয়। ‘মনে আছে, ফার্স্ট ইয়ারে আমরা ইফতার করে সরাসরি হলে গিয়ে ক্রিকেট খেলেছিলাম?’—এমন কথায় হাসির ঝড় ওঠে।

ইফতারের সময় সবাই একসঙ্গে হাত তোলে দোয়ার জন্য। সেই মুহূর্তে বন্ধুত্বের বন্ধন যেন আরও গভীর হয়। শহরের কোলাহল থেমে যায়। শুধু থাকে একসঙ্গে থাকার আনন্দ।

সামাজিকতার নতুন রূপ

ইফতার এখন করপোরেট সংস্কৃতিরও অংশ। অফিসে ইফতার পার্টি হয়। সহকর্মীরা একসঙ্গে বসে খায়। এতে সম্পর্ক আরও সহজ হয়। অনেকে এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে পথশিশু বা শ্রমজীবী মানুষের জন্য ইফতার আয়োজন করেন। সেখানেও তৈরি হয় অন্যরকম আড্ডা—যেখানে শ্রেণিভেদ ভুলে মানুষ মানুষকে কাছে টানে।

সোশ্যাল মিডিয়াও ইফতার আড্ডার অংশ হয়ে গেছে। টেবিলভর্তি খাবারের ছবি, সেলফি, ‘রমজান মোবারক’ লেখা পোস্ট—সব মিলিয়ে এক ধরনের ভার্চুয়াল স্মৃতি তৈরি হয়। কেউ কেউ সমালোচনা করেন—এত ছবি কেন? কিন্তু এই ছবিগুলোও তো সময়ের দলিল। কয়েক বছর পর এগুলো দেখেই হয়তো মনে পড়বে—কোন বছরে কার সঙ্গে ইফতার করা হয়েছিল।

শহুরে একাকীত্ব ভাঙার মুহূর্ত

ঢাকা শহরে একাকীত্ব বড় সমস্যা। হাজার মানুষের ভিড়ে থেকেও অনেকে একা। কিন্তু ইফতার আড্ডা সেই একাকীত্ব কিছুটা ভেঙে দেয়। একজন সহকর্মী হঠাৎ বলে, ‘চলুন, আজ একসঙ্গে ইফতার করি।’ একজন পুরোনো বন্ধু ফোন করে, ‘অনেক দিন দেখা নেই, রমজানে একটা দিন ঠিক করি।’

এই ছোট্ট আমন্ত্রণগুলোই মানুষকে আবার সংযুক্ত করে। রোজা রাখার কষ্ট, সারাদিনের ক্লান্তি—সব ভুলে মানুষ বসে পড়ে এক টেবিলে। একসঙ্গে পানি খাওয়ার মুহূর্তে তৈরি হয় অদ্ভুত এক ঐক্যবোধ।

সংযমের ভেতর আনন্দ

রমজান সংযমের মাস। কিন্তু এই সংযম আনন্দকে কমায় না, বরং গভীর করে। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর প্রথম চুমুক পানির যে স্বাদ, তা অন্য সময়ে পাওয়া যায় না। তেমনি সারাদিন অপেক্ষার পর প্রিয় মানুষদের সঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দও আলাদা।

ইফতার আড্ডা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন শুধু দৌড় নয়, মাঝে মাঝে থামতে হয়। একসঙ্গে বসতে হয়। কথা বলতে হয়। ক্ষমা চাইতে হয়। পুরোনো অভিমান ভুলতে হয়।

ইফতার আড্ডা আসলে শহুরে জীবনের এক মানবিক বিরতি। এখানে বন্ধুত্ব নতুন করে জন্ম নেয়। প্রেম আরও নরম হয়। পরিবার একটু কাছে আসে। সহকর্মীরা আন্তরিক হয়ে ওঠে। আর শহর—যে শহর সারাবছর ব্যস্ত ও নির্লিপ্ত—রমজানে কিছুটা কোমল হয়ে যায়।

আজানের ধ্বনি যখন ভেসে আসে, সবাই একসঙ্গে খেজুর মুখে তোলে। সেই মুহূর্তে ধর্ম, সম্পর্ক, শহুরে ব্যস্ততা—সব এক বিন্দুতে মিলিত হয়। ইফতার আড্ডা তাই শুধু খাবার নয়। এটি স্মৃতি। এটি অনুভূতি। এটি শহরের হৃদস্পন্দন।

রমজান শেষ হয়ে যাবে। টেবিলগুলো আবার খালি হবে। কিন্তু ইফতার আড্ডার সেই হাসি, সেই অপেক্ষা, সেই চোখে চোখ রাখা—সেগুলো থেকে যাবে। পরের রমজান পর্যন্ত, আর তারও পরে—স্মৃতির ভেতরে।