পুরান ঢাকার ‘মহব্বতের শরবত’ বানাবেন যেভাবে

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

রমজান এলেই পুরান ঢাকার গলি-মহল্লায় এক বিশেষ রঙ ছড়িয়ে পড়ে। সারাদিনের রোজা শেষে ইফতারের টেবিলে ঠান্ডা, মিষ্টি ও সুগন্ধি একটি পানীয় যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। সেই পানীয়র নাম—‘মহব্বতের শরবত’। ইফতারের সময় অনেক দোকান, রেস্তোরাঁ ও পারিবারিক আয়োজনে এটি পরিবেশন করা হয়। রঙে হালকা লালচে, স্বাদে মিষ্টি, আর গন্ধে কেওড়া ও রুহ আফজার মিশ্র সুবাস—সব মিলিয়ে এটি পুরান ঢাকার রমজান সংস্কৃতির একটি পরিচিত চিহ্ন।

পুরান ঢাকার মানুষের কাছে এই শরবত শুধু তৃষ্ণা মেটানোর পানীয় নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক অভিজ্ঞতা। রমজানে ইফতার মানেই যেমন খেজুর, ফল আর নানা খাবারের সমাহার, তেমনি অনেক জায়গায় এই শরবতটিও টেবিলে থাকে। প্রতিবেশীকে ডেকে নেওয়া, একসঙ্গে ইফতার করা, ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ—এসবের ভেতর দিয়ে শরবতটি হয়ে ওঠে ‘মহব্বত’ বা ভালোবাসার প্রতীক। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে সেই অর্থ।

পুরান ঢাকার বহু পরিবার আজও রমজানে বিশেষভাবে এই শরবত বানায়। কেউ বাসায় তৈরি করে, কেউবা নির্দিষ্ট দোকান থেকে সংগ্রহ করে। ইফতারের সময় ঠান্ডা গ্লাসে পরিবেশিত এই পানীয় রোজাদারদের কাছে এক ধরনের সতেজতা এনে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর নাম জনপ্রিয় হয়েছে ‘মহব্বতের শরবত’ হিসেবে—যদিও এর শিকড় অনেক পুরোনো ইতিহাসে প্রোথিত।

পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ

পুরান ঢাকার সংস্কৃতিতে খাবার ও পানীয় সবসময়ই সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। এখানে উৎসব মানেই পারস্পরিক আপ্যায়ন। রমজানে মহব্বতের শরবত সেই আপ্যায়নেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। রোজার ক্লান্তি শেষে ঠান্ডা শরবত পরিবেশন করা এক ধরনের আন্তরিকতার প্রকাশ। অনেক পরিবার ইফতারের সময় প্রতিবেশীদের শরবত দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়।

এই শরবতকে ঘিরে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, নেই কোনো বাধ্যবাধকতা—বরং এটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সংস্কৃতি। পুরান ঢাকার পুরোনো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এটি আজও টিকে আছে।

ইতিহাসের পথে: মহররমের শরবত

তবে ‘মহব্বতের শরবত’-এর শেকড় আরও গভীরে। ইতিহাস বলছে, এই শরবতের প্রাথমিক রূপ মহররম মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহররম, বিশেষ করে আশুরার দিনে পুরান ঢাকায় একসময় বিশেষ শরবত বিতরণের রীতি ছিল।

মহররম মাস মুসলিম ইতিহাসে গভীর শোকের সময়। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে এই মাসে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। আশুরার দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় বহু শতাব্দী ধরে এই দিনকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন হতো।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই পুরান ঢাকায় মহররম উপলক্ষে বড় তাজিয়া মিছিল বের হতো। মোঘল আমলে ঢাকার শাসকদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে—বিশেষ করে নায়েব ও নাজিম হিসেবে—অনেক শিয়া কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতেন। তাদের উদ্যোগেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব ইমামবাড়া মহররমের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আশুরার দিনে শিয়া মুসলিমরা কারবালার স্মরণে শোক প্রকাশ করতেন, মাতম করতেন। অন্যদিকে সুন্নি সমাজের অনেকেই এই দিনে বিশেষ খাবার রান্না করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশুরা ঢাকায় একটি সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সীমার বাইরে গিয়ে সার্বজনীন রূপ লাভ করে।

এই দিনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল ‘মহররমের শরবত’। মোঘল আমল থেকেই ঢাকায় দুধ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি এই শরবত বিতরণের রীতি চালু ছিল। মূলত সুবেদার বা নায়েবদের উদ্যোগে সাধারণ মানুষকে খাবারের পাশাপাশি এই শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। পরে ঢাকার নবাব পরিবারও প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এটি তৈরি করে প্রজাদের মধ্যে বিতরণ করত।

এই শরবতের উৎপত্তি বাংলায় নয়। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, এর ধারা তুরস্কে অটোমান সাম্রাজ্যের সময় প্রচলিত ছিল। সেখান থেকে এটি দিল্লি ও লক্ষ্ণৌ হয়ে উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষে বাংলায় জনপ্রিয় হয়। যদিও এর সূচনা শিয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তবে ঢাকার সুন্নি নবাবরাও এর সামাজিক মূল্য উপলব্ধি করে একে আপ্যায়নের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি ছিল সম্পূর্ণ সৌজন্য ও মানবিকতার প্রকাশ।

সময় বদলেছে। জমিদারি প্রথার বিলোপ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে এই মহররমকেন্দ্রিক শরবত বিতরণের রীতি কমে যায়। মহররম উদযাপনও ক্রমে ভিন্ন রূপ নেয়। তবে শরবতের ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি—বরং এটি নতুন পরিচয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

‘মহব্বতের শরবত’: নামের নতুন রূপ

আজকের পুরান ঢাকায় মহররমের ঐতিহ্যবাহী শরবতের আধুনিক সংস্করণই পরিচিত ‘মহব্বতের শরবত’ নামে। বিশেষ করে রমজান মাসে এটি ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। ইফতারের সময় অনেক জায়গায় এটি পরিবেশন করা হয়। 
নাম বদলালেও পানীয়টির চরিত্র একই—দুধের তৈরি মিষ্টি শরবত, যা মানুষকে একত্র করে। আশুরার শোকময় স্মৃতি থেকে শুরু হয়ে এটি এখন রমজানের আনন্দঘন পরিবেশে স্থান করে নিয়েছে। ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় থেকে উদ্ভূত হলেও বর্তমান রূপে এটি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক।

রেসিপি: কীভাবে বানাবেন মহব্বতের শরবত

এবার দেখা যাক এই জনপ্রিয় শরবতটি কীভাবে তৈরি করা যায়।

প্রথমে এক লিটার ঠান্ডা দুধ নিতে হবে। দুধটি ঘন হলে ভালো। চাইলে গরম দুধ ফুটিয়ে ঠান্ডা করে ব্যবহার করা যেতে পারে, অথবা বাজারের পাস্তুরিত তরল দুধও ব্যবহার করা যায়।

এরপর এতে দুই চামচ চিনি অথবা প্রায় এক চামচ কনডেন্সড মিল্ক যোগ করতে হবে। ভালোভাবে নেড়ে মিষ্টি মিশিয়ে নিতে হবে।

তারপর দুই থেকে আড়াই টেবিল চামচ রুহ আফজা মেশাতে হবে। এটি শরবতে রঙ ও স্বাদ যোগ করবে। সঙ্গে এক টেবিল চামচ কেওড়া জল দিলে সুগন্ধ আরও বাড়বে।

এরপর প্রায় ৫০ গ্রাম পেস্তাবাদাম কুচি করে মেশাতে হবে। সব উপকরণ ভালোভাবে নেড়ে নিতে হবে।

চাইলে এতে অল্প লাল জেলি (জিলেটিন বা চায়না গ্রাস) যোগ করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে অল্প সাবুদানাও ব্যবহার করা যায়। তবে এগুলো না দিলেও শরবতের স্বাদ ঠিক থাকবে।

সবশেষে প্রয়োজনমতো বরফ দিয়ে গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন ঠান্ডা ঠান্ডা মহব্বতের শরবত।