জেনেশুনেও ইফতারে প্রতি বছর একই ভুল

জান্নাতুল বুশরা

পবিত্র রমজান মাস আমাদের জন্য আত্মসংযম, ধৈর্য এবং ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলার একটি বিশেষ সময়। আমরা সবাই এই বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা বলি, আলোচনা করি। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিই, হোয়াটসঅ্যাপে নানা মেসেজ শেয়ার করি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত কিছু জানার পরও আমরা কি সত্যিই ইফতারের সময় সংযম রাখতে পারি?

সারাদিন আমরা রোজা রাখি। এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত খাই না। কর্মজীবিরা রোজার দিনগুলোতে বীরত্বের সঙ্গে বিকেল ৩টার চায়ের অভ্যাসকে সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলেন। দিনের বেলা আমরা অনেকটাই সচেতন থাকি। খাবারের ভিডিও দেখি, কিন্তু নিজে খাই না। মোটামুটি বলা যায়, দিনের সময়টা আমরা ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখি।

কিন্তু মাগরিবের আজান হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরো বদলে যায়।

ঢাকা শহরে আজানের শব্দ তখনো পুরো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই আমরা ইফতারের টেবিলে বসে পড়ি। সামনে থাকে তেলে ভাজা নানা রকম খাবার, মিষ্টি, হালিমসহ আরও অনেক কিছু। সারাদিন সংযমের কথা বললেও, ইফতারের সময় আমরা সেই সংযম ধরে রাখতে পারি না। উল্টো একসঙ্গে অনেক কিছু খেতে শুরু করি।

আসলে আমরা নিজেদের কাছ থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করে ফেলি। আর অনেক সময় এই অতিরিক্ত প্রত্যাশার ফলও আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে ভোগ করতে হয়। যেমন ধরুন—একটা বেগুনি খেলেন, কিন্তু মুখে দেওয়া মাত্রই চেহারায় অতৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠল। অথবা এমন এক বাটি হালিম খেলেন, যার দাম আপনার কাছে মোটেই সন্তোষজনক মনে হলো না।

নতুন নতুন খাবার পরখ করতে ভালোবাসেন এমন কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিল। তারা জানান, প্রতি বছরই ইফতারের সময় সংযম ধরে রাখার জন্য নিজেদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, রমজান এলেই তারা এই প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হন।

উন্নয়নকর্মী তানভীর আহমেদ নতুন খাবার পরখ করতে বেশ পছন্দ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় পুরান ঢাকা ও চকবাজারের ইফতারের কথা শুনেছি। তাই একদিন সেখানে গিয়ে চারপাশের পরিবেশ আর ইফতারের নানা আইটেমের স্বাদ এক্সপ্লোর করার ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু কী আর বলব—সেখানে মানুষের এত ভিড় যে দাঁড়িয়ে থাকা, এমনকি ঠিকমতো নিশ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল।’

একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, ‘আর “বড় বাপের পোলায় খায়” নামে যে খাবারটা আছে, সেটা আমার কাছে একেবারেই ভালো লাগেনি। সত্যি বলতে আমি বুঝতে পারি না, একজন বড়লোকের ছেলে কেন ইফতারে এমন একটা খাবার খাবে! যদি কখনও ওই “বড় বাপের পোলার” সঙ্গে আমার দেখা হতো এবং নিশ্চিত হতে পারতাম যে সে সত্যিই এই খাবারটা খায়, তাহলে আমি তাকে বলতাম—ধনী না হয়ে বরং গরিব হও, আর অন্য কিছু দিয়ে ইফতার করো।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলশানের এক ব্যাংক কর্মকর্তা ‘প্রিয়িয়াম হালিম’ নামে বিক্রি হওয়া একটি হালিম খাওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি বলেন, তার এক সহকর্মী তাকে এই খাবারের কথা জানিয়েছিলেন। সেই কথা শুনে তিনি প্রায় ৪৫ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে হালিমটি কেনেন এবং আশা করেছিলেন এটি খুবই সুস্বাদু হবে। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হয়নি। তিনি আফসোস করে বলেন, ‘এরপর থেকে মানুষের কথার ওপর আমার ভরসা অনেকটাই কমে গেছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘৪০০ টাকা খরচ করে আমি ভেবেছিলাম ভালো মানের একটি খাবার পাবো, কিন্তু আমার কাছে এটিকে ডালের ঘাটি মনে হয়েছে।’

সাদিয়া (২৩) তার অফিসের ইফতার নিয়ে কিছুটা ব্যথিত মনেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, তার বস অফিসের ইফতার পার্টি নিয়ে বেশ হাইপ তৈরি করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এটি খুব উপভোগ্য হওয়ার পাশাপাশি সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার একটি দারুণ সুযোগ হবে।

সাদিয়া বলেন, ‘আপনিই বলুন, যাদের সঙ্গে আমি প্রতিদিন আট ঘণ্টা একই অফিসে কাজ করি; এদের মধ্যে কিছু মানুষকে আমার একদমই ভালো লাগে না। তাদের সঙ্গে সারাদিন রোজা রেখে ইফতার করা কতটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে? ইফতারের খাবার খেতে খেতে তাদের সঙ্গে বন্ডিং আরও মজবুত হবে, এটা আমি কোনোভাবেই মনে করি না। আবার, আমি জানিও না যে ইফতারের খাবারগুলো খেতে ঠিক কেমন হবে বরং এর চেয়ে বাসায় ইফতার করাই আমার কাছে অনেক ভালো।’

চিত্রশিল্পী শান্ত রমজানের সময় ট্র্যাফিক জ্যাম নিয়ে তার তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, খাবার সরবরাহকারী একটি অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপে তিনি বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে খাবার অর্ডার করেছিলেন, যেখানে ডেলিভারির সময় দেখানো হয়েছিল ৩০ মিনিট।

একটু থেমে তিনি আবার বলেন, ‘বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে অ্যাপে রাইডারকে ‘কাছাকাছি’ দেখাচ্ছিল। তখন আমার বলার মতো কিছুই ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৬টা ৪১ মিনিটে খাবারটি আমার কাছে পৌঁছায়, এবং সেটি একদমই ঠান্ডা ছিল। সে সময় আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলাম, তাই কোনো বাছবিচার না করেই খাবারটি খেয়ে ফেলি।’

এতোকিছুর পরেও ঢাকার এই চিত্র বোধহয় কখনো পাল্টাবে না। প্রতি বছর রমজান এলেই পুরান ঢাকায় সেই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আমরা ইফতার কিনব যেন এটা করতে আমরা বাধ্য। বেশি দাম দিয়ে খাবার কিনি, যেন সেটাই নিয়ম। সংযমের কথা আমরা মুখে দৃঢ়ভাবে বলি, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।

প্রতিদিন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইফতার কিনি, তার ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করি। সারাদিন রোজা রেখে কোনো নিয়ম না মেনে তাড়াহুড়ো করে খাবার খাই, তারপর অস্বস্তিতে ভুগি। খাবারের মান ভালো না হলেও, আমরা বাড়িয়ে তার প্রশংসা করি। এভাবেই বছর ঘুরে একই চক্রের পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকে।

সবকিছু জেনেশুনেও আমরা যেন প্রতি বছর একই ভুল করে যাই। মনে হয়, রমজানের সংযম শেখার পরিবর্তে আমরা বারবার ক্ষুধার বিলাসিতার কাছেই হার মানি।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী