মণিশংকর থেকে শুধুই শংকর: চাকরির গ্লানি থেকে রূপালি পর্দায়
জীবিকার খোঁজে মরিয়া হয়ে ঘোরা এক ব্যক্তির যাত্রা বিভিন্ন পেশার দ্বারপ্রান্তে নিজেকে আবিষ্কার করায়, আর সে যাত্রায় চাকরি লাভ করা যে শুধুমাত্র একটি মাইলফলক ছাড়া কিছু নয়—তাও বোঝা যায়।
বরং সেই চাকরি, সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত কাজটির সঙ্গে জুড়ে থাকা লোকজনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বহু ফাঁকফোকর, রসবোধ, দুঃখময় সময়ের বিষাদ—সবই তো শংকরের লেখার উপাদান ছিল।
আমরা ঘরের মধ্যে ঘর বানিয়ে বাস করা মানুষেরা কোথাও একটা শেকড় খুঁজে মরি। বাংলার সবচাইতে মিষ্টি শব্দগুলোর একটা বোধহয় ‘পিছুটান’। আর সেই পিছুটান থেকে যতই পালিয়ে বেড়ানো হোক না কেন, কোনো এক মুহূর্তে তা আমাদের ধরেই ফেলে। আর সেই পিছুটানের মধ্যে থাকে পরিবার, পরিবারের চাহিদা। আর পরিবারের চাকা ঘোরাতে চাইলে লাগে জীবিকা নির্বাহের সন্ধান।
‘চাকরি চাই, মানুষের মতো বেঁচে থাকার জন্য একটা চাকরি চাই। কিন্তু কোথায় চাকরি?’
বাঙালি মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার নাম আজও চাকরি। আজও কত সংসার মুখ চেয়ে বসে থাকে আর ভাবে, একটা চাকরি পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বেকারত্বের গ্রাস যখন একজন ব্যক্তিকে পিষ্ট করে মারে, তখন তার সাথে ঘুরতে থাকে রাজনীতি, অর্থনীতি আর সমাজনীতির সবগুলো চাকা।
বেকার জীবনের গ্লানিতে কেমন করে ইয়াব্বড় লম্বা লোকেরা এইটুকু হয়ে যায়—সে চিত্র তুলে ধরেছেন শংকর। একটা মধ্যবিত্ত, ডিল্যুশনাল আনন্দ। দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়, ক্ষয়ে ফেলে কমদামি জুতোর সুকতলাটা, আর তার চেয়েও বেশি ক্ষয়ে যায় নিজের আত্মবিশ্বাস। এর মধ্যে কেউ দু চারটে ভালো কথা বললে, আহা রে-অমন লোকও আছে নাকি—এমন ধরনের ভাবই শংকরের লেখায় প্রধান। জগতটাকে তার মূল চরিত্রেরা ঔদ্ধত্যের কিংবা গরিমার নয়, দেখে যেন ধূলিকণার জীবন থেকে। এমন মাটিতে মিশে থাকা মানুষের দৃষ্টি নিয়েই কি গভীর জৌলুশের কাঠামো আঁকেন তিনি—চৌরঙ্গীর শার্সিতে, ধোপদুরস্ত রুম সার্ভিসে।
মনে হয়, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণি ক্রমেই হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠতে চাইছে, কিন্তু কোথায় গেলে যে অদৃশ্য সেই দেয়ালটাকে অস্বীকার করা যাবে, তাও জানে না।
পাঠকের দৃষ্টি থেকে শংকরকে দেখার অভিজ্ঞতা তার লেখার মধ্যেই। ব্যক্তি শংকরের ছাপ তাতে কতটা প্রখর, তা বুঝে নিতেও কষ্ট হয় না। বনগাঁয়ের এই ‘বাঙাল’ ছেলেটি জীবিকা নির্বাহের জন্য কলকাতার অলিতে গলিতে এত ঘুরেছেন যে, শেষমেষ সাহিত্যের অনুপ্রেরণা হয়ে তা-ই রয়ে গেছে তার লেখায়। কিছু নিজস্ব অভিজ্ঞতা, কিছু অনুধাবন, আর কিছু কল্পিত চরিত্রের হট্টগোলে মশগুল হয়ে গেছে গল্পের যাত্রা। আর পেশাগত দিক দিয়ে বেশিরভাগ সময়েই তো ছিলেন যোগাযোগের লোক, তাই জীবনের সঙ্গে যোগাযোগটা কাগজে-কলমে আনায় তার ছিল সহজ তরতরিয়ে চলা।
সাহিত্যিকদের নিয়ে একটা দুঃখ দুঃখ ফ্যান্টাসি হচ্ছে, বেঁচে থাকতে নামডাক একটু কম হয়। বাংলা সাহিত্যের মতো জায়গায় তো ব্যথা আরও বেশি। বহু লোকে সারাজীবন লিখে গেল, কিন্তু মরবার আগে কোনো খ্যাতি জুটলো না। মরবার পরে কেউ হয়তো খুঁজে পেল এক ঝাঁপি লেখালেখি। রাতারাতি ছেপে জনপ্রিয়, কিন্তু লেখকের আত্মা ততদিনে ভোঁদৌড় দিয়েছে—এমন তো হরহামেশাই হচ্ছে, হবে।
তা খ্যাতির লোভ সেই লেখকেরা আদৌ করেন কি না, বা খ্যাতিতে কতটা বিড়ম্বনায় পড়েন খ্যাতিমানরা—সে অন্য আলাপ।
আমার কাছে শংকরের জীবনকথার একটি বড় বিষয় হচ্ছে, তিনি বেঁচে থাকতেই যথেষ্ট নাম কুড়িয়েছিলেন। এবং সেটি অন্য যেকোনো পাঠক ও লেখকের জন্য আরামদায়ক।
প্রথমে পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় হোটেলে শাহজাহানে গল্প লোকে জানলো ১৯৬৮ সালে। পরে দেশ পত্রিকায় তার উপন্যাস যখন ছাপা হচ্ছে, এমন সময়েই ডাক পেলেন সিনেমার জন্য গল্প ধারের। তাও আবার যে-সে লোকের কাছ থেকে নয়, স্বয়ং মানিকবাবু।
সত্যজিতের কলকাতা ট্রিলজির দুইটি এই একই ঔপন্যাসিকের কলমপ্রসূত। শংকর তাই শুধু ছাপার হরফের লোক হয়ে থাকেননি, একের পর এক পেয়েছেন রূপালি পর্দার যশও। এবং যে সিনেমাগুলো তার গল্প থেকে হয়েছে, তাতে যুক্ত ছিলেন—সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার প্রমুখ, তারাও যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে যোগ হয়ে গেলেন শংকরের সঙ্গে। লেখক নাকি একবার উত্তম বাবুকে বলেন, 'নামখানা তার ছিল বেশ ভারিক্কি গোছের। মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। তবে ওসব মণি আর মুখের উপাধ্যায় ঘুচিয়ে আপামর পাঠকমহল, সিনে পাড়ার লোকেদের কাছে তিনি এক নামে ঘুরে বেড়ান। সে নামখানা আসলে কায়া ঘুচিয়ে এমন ছোটখাটো হয়েছিল কর্মক্ষেত্রেই। এক বিদেশী ব্যারিস্টারের সহকারী হিসেবে কাজ জোটানোর পর দেখলেন, অমন নাম তার মুখে কিম্ভূতকিমাকার কিছু হয়েই বেরোচ্ছে। অতঃপর, শুধু শংকর! সেই নামই রয়ে গেল পরের জীবনেও। কে জানে, দীর্ঘ নামের মণিহার ঘুচিয়েই হয়তো ভালো ছিলেন।'
পৃথিবীকে সরাইখানা বলে খুব আলগোছে যেন এর সবচেয়ে সত্যিটা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শংকর। তার লেখারই মাঝে। এমন একটা কথা, একটু অন্য ফর্মে বলেছিলেন নাট্যগুরু শেকসপিয়ার। পৃথিবী কারো কাছে রঙ্গমঞ্চ, কারো কাছে সরাইখানা, কারো কাছে আজন্ম দিবাস্বপ্ন, তো কারো কাছে একটা দীর্ঘ ভোগান্তির দুঃস্বপ্ন।
জীবনকে দেখার লেন্স তো সকলেই নিজের মতো করে খোঁজে। শংকর তার প্রিয় সরাইখানায় বেশ অনেকটা সময়, বছরের হিসেবে তা ৯৩টি বছর কাটিয়ে পাড়ি দিলেন অন্য কোথাও। যেখানে গেলেন, তাতেও আবিষ্কারের যাত্রা আছে কি না—তা না হয় রয়ে যায় ‘কত অজানারেই’। চৌরঙ্গীর শেষ সংলাপের মতো তিনি হয়তো ফিসফিস করে জানিয়ে গেলেন, ‘আমি এগিয়ে চললাম’।