ডায়াবেটিস-কিডনিসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা রোজা রাখলে যা খেয়াল রাখতে হবে

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

রমজান আত্মসংযমের মাস। রমজান মাসে অন্যান্যদের মতোই ডায়াবেটিস, কিডনি কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মুসলিমরাও রোজা রাখার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে, সঠিক প্রস্তুতি ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখা তাদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী রোজার পূর্বেই ঝুঁকি মূল্যায়ন, খাদ্য পরিকল্পনা ও ওষুধ সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন খান।

যেসব রোগে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন

ডায়াবেটিস

রোজায় দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) বা বেড়ে যেতে পারে (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)। ইনসুলিন বা সালফোনাইলইউরিয়া জাতীয় ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (সিকেডি)

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, ডায়ালাইসিস রোগী বা সাম্প্রতিক কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট রোগীদের জন্য দীর্ঘসময় পানি পান না করা বিপজ্জনক হতে পারে। এতে ডিহাইড্রেশন, ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা ও কিডনি ফাংশনের অবনতি ঘটতে পারে।

হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, সাম্প্রতিক হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিউর থাকলে রোজা রাখার আগে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।

লিভার রোগ

সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউরে আক্রান্ত রোগীদের পুষ্টি ও তরলের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া গ্যাস্ট্রিক আলসার, অ্যাজমা বা সিওপিডি, মৃগীরোগ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দুগ্ধদানকারী মায়ের রোজা রাখার বিষয়ে সর্তকর্তা অবলম্বন করতে হবে।

রোজা রাখার ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ কেন জরুরি

রোজা শুরুর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ—

  • রোগের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা যায়

  • ওষুধের নির্দিষ্ট সময় ও পরিমাণ পরিবর্তন করা যায়

  • কারা রোজা রাখা থেকে বিরত থাকবেন—তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

  • বিশেষত ইনসুলিন গ্রহণকারী ডায়াবেটিক রোগী ও কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ের রোগীদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যারা রোজা রাখার ক্ষেত্রে সর্তকতা মেনে চলবেন বা যাদের রোজা রাখা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ

অ্যামেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন (এডিএ) রমজানে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রোগীদের শ্রেণিবিন্যাস করেছে—

১. অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি (ভেরি হাই রিস্ক): যাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই রোজা রাখা যাবে না।

  • গত ৩ মাসে রক্তের শর্করা কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিক কোমা)

  • বারবার হাইপারগ্লাইসেমিয়া

  • দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড সুগার

  • টাইপ-১ ডায়াবেটিস

  • গত ৩ মাসের মধ্যে কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) বা হাইপরোসমোলার হাইপারগ্লিসেমিক সিনড্রোম (এইচএইচএস)

  • দীর্ঘমেয়াদি ডায়ালাইসিস রোগী

  • অন্তঃসত্ত্বা

২. উচ্চ ঝুঁকি (হাই রিস্ক): যাদের জন্য রোজা রাখা উচিত না বা রোজা না রাখাই উত্তম।

  • মাঝারি মাত্রায় উচ্চ রক্তে শর্করা (১৫০-৩০০ এমডি/ডিএল)

  • গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) ৭.৫-৯%

  • কিডনি অকার্যকারিতা

  • জটিল হৃদরোগ বা রক্তনালীর জটিলতা

  • বাসায় একা থাকেন এরকম অবস্থায় ইনসুলিন বা সালফোনাইল ইউরিয়া গ্রহণকারী

  • অসুস্থ বার্ধক্য

৩. মাঝারি ঝুঁকি (মডারেট রিস্ক): যারা সর্তকতার সঙ্গে নিয়ম মেনে রোজা রাখতে পারবেন।

  • যাদের ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত

  • যারা স্বল্পমেয়াদি ইনসুলিন সিক্রোটোগগ (রিপাগ্লিনাইড/নাটেগ্লিনাইড) গ্রহণ করেন।

৪. নিম্ন ঝুঁকি (লো রিস্ক): তাদের রোজা রাখার ক্ষেত্রে বাধা নেই।

  • খাদ্য নিয়ন্ত্রণে রক্তের শর্করা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত

  • দীর্ঘমেয়াদি কোনো অসুস্থতা নেই

ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগীদের সেহরি যেমন হওয়া উচিত

ডা. আবেদ হোসেন খান বলেন, ডায়াবেটিস, কিডনি বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সেহরি হতে হবে ধীরে হজম হয় ও রক্তে শর্করার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ায় এমন খাবার (লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স) দিয়ে। যেমন:

  • আটার রুটি বা লাল চালের ভাত (পরিমিত)

  • ডাল, সবজি

  • ডিমের সাদা অংশ

  • কম চর্বিযুক্ত মাংস (পরিমিত), মাছ

  • পর্যাপ্ত পানি (কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ)

  • অতিরিক্ত মিষ্টি, সেমাই, পরোটা, তেল চর্বিযুক্ত খাবার, বেশি লবণযুক্ত খাবার (বিশেষত কিডনি রোগীদের জন্য) এড়িয়ে চলতে হবে।

ইফতার যেমন হওয়া উচিত

  • হঠাৎ রোজা ভাঙার পরপরই অতিরিক্ত খাবার খাওয়া যাবে না।

  • উপযুক্ত ইফতার:

  • ১-২টি খেজুর

  • পর্যাপ্ত পানি

  • ছোলা, মুড়ি (পরিমিত)

  • ফল (আপেল, পেঁপে, পেয়ারা)

  • হালকা ঘরে তৈরি খাবার

এড়িয়ে চলুন—ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত, কোমল পানীয়।

রোজায় রোগীরা যেভাবে ওষুধ খাবেন

এডিএর নীতিমালা অনুযায়ী, রমজান মাসে চিকিৎসাব্যবস্থা পরিকল্পনা ব্যক্তিভেদে আলাদা হবে। সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। দিনে একাধিকবার রক্তে শকর্রার পরিমাণ পরীক্ষা করতে হবে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস এবং ইনসুলিন নির্ভর টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন গ্রহণে ভঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং রক্তে শর্করার পরিমাণ ঠিক রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিক রোগীদের ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে

  • দিনে একবার মুখে খাওয়ার ওষুধ থাকলে তা ইফতার বা সেহরিতে নেওয়া যায়।

  • দিনে দুইবারের ওষুধ ইফতার ও সেহরিতে ভাগ করে নেওয়া যায়। তবে সেক্ষেত্রে ওষুধের ডোজ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিতে হবে।

  • ইনসুলিন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের ডোজ অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিতে হবে (সাধারণত, দুই বেলা ইনসুলিনের ডোজ থাকলে সকালের ডোজ রোজা ভাঙার পর নিতে হবে এবং রাতের ডোজটি সেহরির আগে অর্ধেকের সমপরিমাণ নিবে)। তবে শর্করার মাত্রা অনুযায়ী ইনসুলিনের ডোজ কম-বেশি করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা অত্যন্ত জরুরি।

কখন রোজ ভাঙতে হবে?

  • রক্তে শর্করা ৬০ এমডি/ডিএল (৩.৩ এমএমওএল/এল) হলে সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভাঙতে হবে।

  • রোজার শুরুতে এমডি/ডিএল (৩.৯ এমএমওএল/এল) বা তার আশেপাশে থাকলে তৎক্ষণাৎ মিষ্টিজাতীয় কিছু খেয়ে নিতে হবে।

  • রক্তে অতিরিক্ত শর্করা বেড়ে ৩০০ এমডি/ডিএল (১৬.৭ এমএমওএল/এল) হয়ে গেলে।

রোজায় যেসব সর্তকতা অবশ্যই মানতে হবে

রক্তে শর্করা নিয়মিত মাপা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, ঘাম, কাঁপুনিসহ নানাবিধ উপসর্গ দেখা দেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান (ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত), অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা, ধূমপান ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন বর্জন করতে হবে।

ডা. আবেদ হোসেন খান বলেন, রোজা একটি ইবাদত। তবে নিজের শরীরও মহান আল্লাহর আমানত। তাই রোজা রাখার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতনতা ও সঠিক নিয়ম মেনে চললে অনেক রোগীই নিরাপদে রোজার বরকত লাভ করতে পারেন।