গরমে ঢাকায় আমরা যেভাবে বেঁচে আছি
ঢাকার গরম এখন শুধু আর নির্দিষ্ট কোনো ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন একধরনের স্থায়ী অবস্থা, সহ্যশক্তির পরীক্ষা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শরীরের ভেতর যেন একটা অদৃশ্য চুলা জ্বলতেই থাকে। ফ্যান ঘোরে, কিন্তু বাতাস লাগে না; গায়ে লাগে কেবল গরমের ঢেউ। ঘরের ভেতর বসে থাকলেও মনে হয়, রোদটা যেন দেয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়েছে। আমরা যারা এই শহরে থাকি, তারা এখন আর গরমকে ঠেকানোর চেষ্টা করি না, গরমের সঙ্গে আমরা একধরনের সমঝোতায় পৌঁছে গেছি।
বাসা-বাড়ির গরমটা আলাদা এক যন্ত্রণা। কংক্রিটের এই শহরে ইট-সিমেন্ট যেন দিনের বেলায় সূর্যের তাপ গিলে নেয়, আর রাতে তা ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয়। ফলে রাতও ঠান্ডা হয় না। ফ্যানের নিচে শুয়ে থেকেও ঘাম ঝরে, বালিশ ভিজে যায়, চাদর গরম হয়ে ওঠে। অনেকের বাসায় এসি নেই—তাদের জন্য গরম মানে শুধু অস্বস্তি না, ক্লান্তি, বিরক্তি, কখনো কখনো রাগও। শিশুরা ঘেমে কাঁদে, বয়স্করা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পায়। লোডশেডিং হলে তো কথাই নেই—একটা ঘরের ভেতর সবাই যেন হাঁসফাঁস করতে থাকে।
এই শহরে গাছ নেই—এই কথাটা আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু এখন সেটা অনুভব করা যায়। রাস্তার পাশে যেখানে গাছ থাকার কথা, সেখানে কংক্রিট। নতুন বিল্ডিং উঠছে, পুরোনো গাছ কাটা পড়ছে। সবুজের জায়গা দখল করে নিয়েছে ধুলা, ধোঁয়া আর টিনের ছাদ। ফলাফল—ঢাকার বাতাস গরম হয়ে থাকে, থমকে থাকে। বাতাস যেন চলাচল করতে ভুলে গেছে। গরমের দিনে ছায়া খুঁজে পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার। একটা গাছের নিচে দাঁড়াতে পারলে মনে হয়, যেন একটু বাঁচা গেল।
সবচেয়ে বেশি কষ্টটা কারা পাচ্ছে—এটা বোঝার জন্য খুব বেশি ভাবতে হয় না। শ্রমজীবী মানুষগুলো এই শহরের গরমের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করছে। রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিক—তাদের জন্য গরম মানে কেবল অস্বস্তি না, প্রতিদিনের সংগ্রাম। দুপুরের রোদে যখন রাস্তা পুড়ে ওঠে, তখনো তারা কাজ করে যাচ্ছে। মাথায় গামছা, শরীরে ঘাম, তবুও থামার সুযোগ নেই। থামলে আয় বন্ধ, আয় বন্ধ মানে খাবার বন্ধ। তাদের শরীর যেন এই গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু তাতে কষ্ট কমে না। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে শরীরটা ক্ষয়ে যায়।
অফিসে যারা কাজ করে, তাদের জন্য একটা অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অফিসে ঢুকলেই ঠান্ডা বাতাস—এসি চলতে থাকে, শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়, কাজ করতে সুবিধা হয়। কিন্তু অফিস থেকে বের হওয়া মানেই এক ধাক্কায় বাস্তবে ফিরে আসা। বাইরে পা রাখতেই গরমের তাপ শরীরকে আঘাত করে। যেন কেউ হঠাৎ করে চুলার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই হঠাৎ পরিবর্তন শরীর কিংবা মন—কোনোটার জন্যেই ভালো না। ভেতরে আর বাইরে—দুটো আলাদা জগত। একটাতে আরাম, আরেকটাতে সংগ্রাম।
এর সঙ্গে যোগ হয় পোশাকের যন্ত্রণা। গরমের মধ্যে ফর্মাল ড্রেস—শার্ট, প্যান্ট, টাই—এগুলো যেন এই আবহাওয়ার সঙ্গে পুরোপুরি বেমানান। তবুও অফিসের নিয়ম মানতে হয়। ঘাম ঝরতে থাকে, শার্ট ভিজে যায়, কলার শক্ত হয়ে থাকে। যারা বাইক বা বাসে করে অফিসে যায়, তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে, ঘামে ভিজে অফিসে পৌঁছাতে হয়—তারপর নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা!
পাবলিক বাসের কথা না বললেই নয়। ঢাকার বাস মানে শুধু যানবাহন না, একধরনের পরীক্ষা। গরমের দিনে সেই পরীক্ষা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বাসে ওঠার পর মনে হয়, বাতাস নেই। জানালা খোলা, কিন্তু হাওয়া ঢোকে না। চারপাশে গাদাগাদি মানুষ, সবার শরীর থেকে আসতে থাকে ঘামের গন্ধ, ক্লান্তির গন্ধ। কেউ কারও দিকে তাকায় না, কারণ সবাই একই অবস্থায় আছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়াটা যেন একটা যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধটা প্রতিদিনই লড়তে হয়।
ঢাকার গরমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনও বদলে গেছে। বাইরে বের হওয়ার আগে দুবার ভাবতে হয়। পানি সঙ্গে রাখা এখন অভ্যাস না, প্রয়োজন। অনেকেই ছাতা ব্যবহার করে, কেউ কেউ সানগ্লাস পরে—কিন্তু এগুলো কেবল সাময়িক স্বস্তি দেয়। আসল সমস্যা থেকে যায়। রাস্তার ধুলো, গরম বাতাস, যানজট—সব মিলিয়ে বাইরে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে।
রাতেও খুব একটা স্বস্তি নেই। দিনের গরম জমে থাকে, রাতে ধীরে ধীরে বের হয়। ঘুম আসতে চায় না, বারবার ঘুম ভেঙে যায়। অনেকেই ছাদে উঠে একটু বাতাস খোঁজে, কিন্তু সেখানে গিয়েও দেখা যায়, বাতাস গরম। শহরটা যেন সারাদিনের তাপ জমিয়ে রেখে রাতে ছেড়ে দেয়।
এই গরম আমাদের মেজাজেও প্রভাব ফেলে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে রাগ বেড়ে যায়, ধৈর্য কমে যায়। রাস্তায় ঝগড়া, বাসে কথা কাটাকাটি—এসব যেন বেড়ে গেছে। কারণ শরীর যখন অস্বস্তিতে থাকে, তখন মনও শান্ত থাকে না। আমরা সবাই একটু বেশি বিরক্ত, একটু বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছি।
তবুও আমরা বেঁচে আছি। এই শহরে প্রতিদিন বের হচ্ছি, কাজ করছি, ফিরছি। গরমের সঙ্গে লড়াই করছি, আবার মানিয়েও নিচ্ছি। কেউ ঠান্ডা পানি খেয়ে একটু স্বস্তি খোঁজে, কেউ ছায়ায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। কেউ বাসার ভেতর ফ্যানের নিচে বসে থাকে, কেউ রাতে দেরি করে ঘুমাতে যায়, যেন গরমটা একটু কম লাগে।
ঢাকার গরম আমাদের থামিয়ে দিতে পারেনি, কিন্তু আমাদের বদলে দিয়েছে। আমরা এখন জানি—এই শহরে বাঁচতে হলে শুধু ইচ্ছাশক্তি না, সহ্যশক্তিও দরকার। গরমটা হয়তো কমবে না, কিন্তু আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে শিখে নিচ্ছি—কীভাবে এর মধ্যেও টিকে থাকতে হয়।


