এখনো বাড়ির পথে মানুষ, ভিড় নেই গাবতলী, ভাড়াও কম
মোহাম্মদপুরে একটি প্রতিষ্ঠানে গৃহকর্মীর কাজ করেন জুলেখা বেগম (৪৫)। সহকর্মী ছুটিতে থাকায় এবার ঈদে ছুটি পাননি তিনি।
তার ছোট দুটি সন্তান সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে নানীর কাছে থাকে। ঈদের আগের দিন থেকেই মার জন্য পথ চেয়ে আছে দুই শিশু।
ঈদের আগে বাসের টিকিটের দাম বেশি থাকায় ও রাস্তায় যানজট থাকায় পরেই সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন ১০ বছর আগে স্বামী হারানো জুলেখা।
তাই ঈদের তৃতীয় দিন যখন সবাই কাজে ফিরতে শুরু করেছে, তখন রাজধানীর গাবতলীতে সিরাজগঞ্জের বাসের টিকিট কাটছেন জুলেখা। আজ সোমবার বিকেলে তার সঙ্গে দেখা হয় সেখানে।
দ্য ডেইলি স্টারকে জুলেখা বলেন, 'পাঁচ দিনের ছুটি পেয়েছি। বাচ্চারা আমার জন্য পথ চেয়ে আছে। একটু পরপরই তাদের নানীর কাছে জানতে চায়, মা কখন আসবে।'
ছোট্ট দুই শিশুকে ছাড়া এই রাজধানীতে তার ঈদ হয়নি। বাড়ি ফিরে ওদের জড়িয়ে ধরে আদর করলেই ঈদ শুরু হবে, বলেন তিনি।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের মূল ছুটি শেষের দিকে হলেও নাড়ির টানে মানুষের বাড়ি ফেরা থামেনি। বিশেষ করে ঈদের সময় সামর্থ্যের অভাবে যারা ঢাকা ছাড়তে পারেননি, সেই নিম্নআয়ের ও শ্রমজীবী মানুষ এখন অর্ধেকের কম ভাড়ায় অনেকটা নির্ঝঞ্ঝাট ও স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন।
বিকেলে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। নেই চিরচেনা ভিড়-ভোগান্তি ও বাড়তি ভাড়ার জুলুম। যাত্রী সংকটে বাসগুলো ফাঁকা থাকলেও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ছিল বাড়ি ফেরার স্বস্তি।
জুলেখার মতো ভাঙ্গারি দোকানের কর্মচারী মোজাম্মেল সরকার সপরিবারে রংপুরের পীরগাছা যাওয়ার জন্য গাবতলী এসেছেন।
তিনি জানান, ঈদের আগে অতিরিক্ত ভিড় আর এক হাজার টাকার ওপর ভাড়া হওয়ায় তখন বাড়ি যাননি।
আজ তিনি ৫০০ টাকা ভাড়ায় সপরিবারে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
মোজাম্মেল বলেন, ‘ঈদের দিন ও পরের দিন বখশিশ পেয়েছি, কাজ করেও ভালোই আয় হয়েছে। এখন পকেটে টাকা আছে, ভিড়ও কম, তাই শান্তিতে বাড়ি যাচ্ছি।’
একইরকম খুশি দেখা গেল কামরাঙ্গীরচরের রিকশাচালক বাসুদেবকে। ৫০ বছর বয়সী বাসুদেব প্রতিবছর ঈদের দুই দিন পর লালমনিরহাটের পাটগ্রামে গ্রামের বাড়ি যান।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঈদের আগে যেখানে ভাড়া ছিল ১২০০-১৩০০ টাকা, আজ তা মাত্র ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে।'
গত তিন দিনে খরচ বাদে ৫ হাজার টাকা আয় করেছেন তিনি, যা স্বাভাবিক সময়ে আয় করতে ১০ দিন সময় লাগত।
বাড়ি ফেরা মানুষের পাশাপাশি ঢাকা ফেরা মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সোহেল শেখের আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে অফিস শুরু। তাই পরিবার নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে আজ বিকেলে ঢাকা পৌঁছেছেন।
অন্যদিকে, দিনাজপুর থেকে দুই সন্তানসহ ঢাকায় ফিরেছেন অটোরিকশাচালক দুলাল হোসেন ও তার স্ত্রী গার্মেন্টস শ্রমিক মনোয়ারা বেগম।
মনোয়ারা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার তার গার্মেন্টস খুলবে। আরও দুই দিন গ্রামে থাকার ইচ্ছা থাকলেও টাকা ফুরিয়ে যাওয়ায় আত্মীয়র কাছ থেকে ধার করে আগেভাগেই ঢাকা ফিরেছি।’
আজ সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের তেমন ভিড় নেই। বাসগুলোও অর্ধেকের বেশি আসন খালি রেখে গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে।
হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার স্টাফ লালন হাওলাদার জানান, বিকেল ৫টা পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে তাদের মাত্র ১০টি বাস ছেড়ে গেছে। রাতে আরও দুটি ছাড়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘৪০ সিটের বাসে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী নিয়েই ছাড়তে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ২০-২৫টি গাড়ি ছাড়ে, আর ঈদের সময় তো তার চেয়েও বেশি। কিন্তু এখন যাত্রী সংখ্যা অনেক কম।’