বার্নের বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া অমরত্ব: পুসকাসের অসহায় দৃষ্টি
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিককার কথা। ইউরোপের সবুজ গালিচায় হাঙ্গেরি তখন কেবল একটি দল নয়, তারা ছিল ফুটবলের এক একনিষ্ঠ সাধক। মাঠের এগারো জন যেন এক অদৃশ্য অর্কেস্ট্রার সুরলিপি মেনে চলতেন। বিশ্ব তাদের চিনেছিল ‘ম্যাজিক ম্যাগিয়ারস’ নামে। বল যখন তাদের পায়ে থাকত, মনে হতো কোনো দক্ষ কবি তার শ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তিগুলো সাজাচ্ছেন।
এই জাদুকরী সুরের প্রধান কারিগর ছিলেন ফেরেঙ্ক পুসকাস, যাকে বলা হতো ‘গ্যালোপিং মেজর’। তার মাঝারী গড়ন আর ভারী শরীরে লুকিয়ে ছিল এক অতিপ্রাকৃত শক্তি। তার বাঁ পায়ের এক একটি শট যেন ছিল নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা, যা গোলপোস্টের কোণগুলোকে খুঁজে নিত অবলীলায়। গোটা ইউরোপ সেদিন এই ম্যাগিয়ার রাজপুত্রের সামনে নতজানু হয়ে থাকতো এক অদ্ভুত বিস্ময় আর শ্রদ্ধা নিয়ে।
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরি যখন সুইজারল্যান্ডে পৌঁছায়, তখন তারা ছিল প্রায় অপরাজেয়। টানা চার বছর তারা কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হারেনি। এর মধ্যেই তারা ইংল্যান্ডকে তাদের নিজের ঘরে ৬–৩ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। সেই দল বিশ্বকাপে এসেছিল যেন একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে, 'অমরত্ব'। আর ফুটবলবিশ্বের প্রায় সবাই বিশ্বাস করেছিল, এই বিশ্বকাপের ট্রফি শেষ পর্যন্ত যাবে বুদাপেস্টেই।
গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরি যে ফুটবল খেলেছিল, তা যেন একতরফা ঝড়। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৯-০, তারপর পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৮-৩। প্রতিপক্ষরা যেন কেবল মাঠে উপস্থিত ছিল, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি হাঙ্গেরির হাতে। পুসকাস তখন গোল করছেন, পাস দিচ্ছেন, দলকে সামনে নিয়ে যাচ্ছেন এমন এক আত্মবিশ্বাসে, যেন বিশ্বকাপ ট্রফি ইতিমধ্যেই তার হাতে।
কিন্তু সেই জার্মানির বিপক্ষেই ঘটে যায় অদৃশ্য এক ট্র্যাজেডির শুরু। ম্যাচের এক পর্যায়ে জার্মান ডিফেন্ডার ভার্নার লিব্রিশের শক্ত ট্যাকলে মাটিতে পড়ে যান পুসকাস। তার গোড়ালিতে গুরুতর আঘাত লাগে। মাঠের মধ্যে তখনও ম্যাচ চলছে, কিন্তু হাঙ্গেরির জন্য যেন সময় থমকে যায়। পুসকাসকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তার মুখে তখন ব্যথার ছাপ, আর দর্শকদের মনে অদ্ভুত এক উদ্বেগ।
ডাক্তাররা বলেছিলেন, এই চোট নিয়ে তার বিশ্বকাপে ফেরার সম্ভাবনা খুব কম। হাঙ্গেরি অবশ্য তার অনুপস্থিতিতেও এগিয়ে যায়। ব্রাজিলকে হারায় এক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে, তারপর উরুগুয়েকে হারিয়ে পৌঁছে যায় ফাইনালে। কিন্তু পুরো দেশের মনেই তখন একটি প্রশ্ন, পুসকাস কি ফিরবেন?
শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরেছিলেন। শরীরের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে, ব্যথাকে সঙ্গী করে। কারণ একজন অধিনায়কের কাছে কখনো কখনো শরীরের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে দায়িত্ব, স্বপ্ন, আর ইতিহাসের ডাক।
১৯৫৪ সালের ৫ জুলাই।
বার্ন শহরের আকাশে সেদিন মেঘ জমেছিল। ফাইনালের দিনটিতে বৃষ্টি পড়ছিল অবিরাম। ওয়াঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামের মাঠ কাদায় ভিজে ভারী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই মাঠেই দাঁড়িয়ে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দলটি, তাদের সামনে ছিল অমর হওয়ার শেষ দরজা।
খেলার শুরুটা ছিল মোহময় এক বিভ্রমের মতো। রেফারির বাঁশি বাজার পর প্রথম দশ মিনিটেই মনে হলো, ইনজুরি যেন পুসকাসের জাদুকরী পায়ে কোনো শেকলই পরাতে পারেনি। মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় সেই চোট পাওয়া, যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাঁ পায়েই বল জালে জড়ালেন তিনি। স্টেডিয়ামের নীরবতা চিরে গর্জে উঠল হাঙ্গেরিয়ানদের উল্লাস। এর ঠিক দুই মিনিট পর জোলতান জিবরের গোলে ব্যবধান দাঁড়াল ২-০।
অমরত্বের সুধা যেন তখন পুসকাসের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, ইনজুরি নিয়েও পুসকাস যেন ফুটবলের এক অজেয় দেবতা।
কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো মানুষের কল্পনার চেয়েও অদ্ভুত গল্প লেখে।
বার্নের সেই ভারী বৃষ্টি আর কর্দমাক্ত মাঠ ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করল হাঙ্গেরির শৈল্পিক ফুটবলকে। খেলার ১০ মিনিট যেতে না যেতেই ম্যাক্স মরলক আর হেলমুট রানের গোলে প্রথমার্ধেই স্কোরলাইন হয়ে গেল ২-২।
হঠাৎ করেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। এখন আর হাঙ্গেরির একতরফা আধিপত্য নেই। মাঠে লড়াই শুরু হয় সমানে সমানে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি বাড়ছিল। খেলোয়াড়দের জার্সি ভারী হয়ে উঠছিল। মাঠের কাদা যেন দৌড়কে ধীর করে দিচ্ছিল। আর পুসকাস। পায়ের ফুলে ওঠা পেশিগুলো তখন বিদ্রোহ শুরু করেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অনুভব করছিলেন সুতীব্র এক যন্ত্রণা, যেন হাজারো তীক্ষ্ণ সুঁচ বিদ্ধ হচ্ছে তার গোড়ালিতে। তবু তিনি ছুটছিলেন, দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছিলেন এক অধরা স্বপ্নের পেছনে।
ম্যাচ যখন শেষের দিকে, তখনও স্কোর ২–২। হাঙ্গেরি আক্রমণ করছে, কিন্তু ভাগ্য যেন তাদের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই, ৮৪ মিনিটে, জার্মান ফরোয়ার্ড হেলমুট রাহন বল পেলেন। তিনি একটু জায়গা তৈরি করলেন, তারপর একটি শট নিলেন।
বল জালে। পুসকাসের মনে হলো যেন তাঁর হৃৎপিণ্ডটাই কেউ ছিঁড়ে নিয়েছে। ৩–২।
স্টেডিয়ামের একদিকে তখন উল্লাসের বিস্ফোরণ, আর অন্যদিকে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। হাঙ্গেরির খেলোয়াড়রা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, কী ঘটল।
সতীর্থের বাড়ানো একটি নিখুঁত পাস থেকে বল পেলেন তিনি, সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে জার্মান রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে বল জড়িয়ে দিলেন জালে! এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, অমরত্ব আবার ফিরে এসেছে তাঁর মুষ্টিতে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, হয়তো এখনও গল্প শেষ হয়নি।
কিন্তু উল্লাসে ফেটে পড়ার আগেই তার চোখ আটকে গেল লাইন্সম্যানের তোলা পতাকায়। অফসাইড।
পুসকাস তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে তখন এমন এক দৃষ্টি, যেখানে ক্লান্তি, অবিশ্বাস, আর গভীর এক অসহায়তা মিলেমিশে ছিল। তিনি যেন বুঝতে পারছিলেন, এই ম্যাচ আর ফিরবে না।
মুহূর্ত পরেই বেজে উঠল রেফারির শেষ বাঁশি। পশ্চিম জার্মানি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আর হাঙ্গেরির জন্য এটি ছিল হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের শোকগাথা।
পুসকাস?
দুই হাত কোমরে দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন মাঠের এক প্রান্তে, বৃষ্টি আর কাদায় মাখামাখি হয়ে। তার চোখে কোনো জল ছিল না, ছিল এক জমাট বাঁধা, অতলস্পর্শী শূন্যতা। যে চোখগুলো একটু আগেও গোলপোস্টের ঠিকানা খুঁজছিল এক ক্ষুধার্ত ঈগলের মতো, সেই চোখ দুটোতে নেমে এসেছিল পৃথিবীর যাবতীয় অসহায়ত্ব। ইনজুরির শারীরিক যন্ত্রণা তখন তার কাছে তুচ্ছ; তার চোখের সামনে দিয়ে, তারই আঙুলের ফাঁক গলে চিরতরে হারিয়ে গেছে বিশ্বকাপ, ধুলোয় মিশে গেছে একটি গোটা প্রজন্মের অমর হওয়ার সুযোগ।
সেই স্থির, নির্বাক দৃষ্টিতে মেশানো ছিল এক অনন্ত আক্ষেপ আর অবিশ্বাস। কাদামাখা জার্সিতে, বৃষ্টিস্নাত শরীরে দাঁড়িয়ে থাকা পুসকাস সেদিন হয়ে উঠেছিলেন শেক্সপিয়রের নাটকের কোনো এক ট্র্যাজিক হিরো। ইতিহাসে জন্ম নিল 'মিরাকল অব বার্ন' বা 'বার্নের অলৌকিকতা'।