গাজ্জানিগার ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির আদ্যোপান্ত
লুসাইল স্টেডিয়ামের মাহেন্দ্রক্ষণ। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসি যখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরলেন, তখন দীর্ঘ এক অপেক্ষার অবসান হলো। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের চমৎকার দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে চিরকাল। এই ট্রফি ছোঁয়া মানেই ফুটবলের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা, আজীবনের জন্য নায়ক বনে যাওয়া। দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে জিনেদিন জিদান কিংবা রোনালদো নাজারিও থেকে বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার— স্বর্ণালি এই বস্তুটিকে আকাশের পানে তুলে ধরে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ফুটবলে পেয়েছেন অমরত্ব।
তবে মেসির হাতে শোভা পাওয়া আধুনিক ট্রফিটি সব সময় এমন ছিল না। ফুটবলের পরম আরাধ্য সম্পদটিরও আছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
কেন এল নতুন ট্রফি?
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরুর পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো ‘জুলে রিমে’ ট্রফি। মেক্সিকো বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে ব্রাজিল যখন চিরতরে ট্রফিটি নিজেদের করে নিল, তখনই ফিফার সামনে দেখা দিল নতুন চ্যালেঞ্জ। নিয়ম অনুযায়ী তিনবারের বিশ্বজয়ীদের ‘জুলে রিমে’ চিরতরে দিয়ে দেওয়ার পর ১৯৭৪ সালের আসরের জন্য প্রয়োজন ছিল একদম নতুন এক নকশা।
ফিফার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের সাতটি দেশ থেকে জমা পড়েছিল মোট ৫৩টি নকশা। শেষ পর্যন্ত ফিফা বেছে নেয় গাজ্জানিগার অসাধারণ এক সৃষ্টি।
গাজ্জানিগার দর্শন: বীরত্বের অনন্য প্রতীক
নকশাটি কেন প্রথাগত ট্রফির চেয়ে আলাদা, তা গাজ্জানিগার বর্ণনায় স্পষ্ট। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'আমি এটি বীরত্বকে পুরস্কৃত করার জন্য তৈরি করেছি। তবে তা কোনো অতিমানবীয় বীরত্ব নয়। এটি প্রথাগত কোনো কাপ নয়।'
শিল্পীর চোখে ট্রফিটির গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে এভাবে, 'রেখাগুলো ভিত্তি থেকে উৎসারিত হয়ে সর্পিলাকারে ওপরের দিকে উঠে গেছে এবং বিশ্বকে আগলে ধরার জন্য বিস্তৃত হয়েছে। ভাস্কর্যের এই জমাটবদ্ধ শরীরের অসাধারণ এক গতিশীল উত্তেজনা থেকে বিজয় উল্লাসের রোমাঞ্চকর মুহূর্তে দুই অ্যাথলেটের অবয়ব ফুটে উঠেছে।'
নকশা নিয়ে গাজ্জানিগার আরও সহজ ব্যাখ্যা ছিল, 'পৃথিবী যেহেতু একটি গোলক, তাই এটি দেখতে অনেকটা ফুটবলের মতোই।'
তার ছেলে জর্জিও গাজ্জানিগার মতে, সিলভিও জানতেন যে এই নকশা কাগজে-কলমে বোঝানো সম্ভব নয়। তাই তিনি ফিফাকে সরাসরি একটি প্লাস্টার মডেল তৈরি করে দেখিয়েছিলেন। ফিফার কর্তারা দেখামাত্রই বুঝেছিলেন, এটি অত্যন্ত ‘ফটোজেনিক’ এবং উঁচিয়ে ধরার জন্য দারুণ এক ট্রফি।
ট্রফির গঠন: নিরেট সোনা না কি ফাঁপা?
১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার (১৪.৫ ইঞ্চি) ও ওজন ৬.১৭৫ কেজি। এর ১৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের ভিত্তিটিতে দুটি স্তরে ব্যবহার করা হয়েছে সবুজ রঙের মূল্যবান পাথর ‘ম্যালাকাইট’।
তবে ট্রফিটি কি সত্যিই পুরোপুরি নিরেট সোনা? নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির রসায়ন বিভাগের ব্রিটিশ প্রফেসর মার্টিন পোলিয়াকফ এক ভিন্ন হিসাব দিয়েছেন। তার মতে, ট্রফিটি যদি ভেতর থেকে পুরোপুরি নিরেট সোনা হতো, তবে এর ওজন হতো অন্তত ৭০ কেজি! কোনো অ্যাথলেটের পক্ষে ৭০ কেজি ওজনের বস্তু মাথার ওপর তুলে ওড়ানো প্রায় অসম্ভব। তাই ধারণা করা হয়, ওপরের গোলক অংশটি ভেতর থেকে ফাঁপা।
ফিফা অবশ্য একে ‘সলিড গোল্ড’ বলে দাবি করে। এর অর্থ হতে পারে, ফাঁপা হলেও এটি অন্য কোনো ধাতুর ওপর সোনার প্রলেপ নয়, বরং এর প্রতিটি অংশই খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি।
ট্রফির ভিত্তি বদল
ট্রফির নিচে ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিটি আসরের চ্যাম্পিয়ন দলের নাম ও সাল খোদাই করা থাকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের পর দেখা যায়, নামগুলো খাঁড়াভাবে লিখলে ভবিষ্যতে আর জায়গা সংকুলান হবে না। তাই বর্তমানে বিজয়ীদের নামগুলো সাজানো হচ্ছে সর্পিলাকারে, যাতে আগামীতে আরও কয়েকটি আসরের চ্যাম্পিয়নদের নাম সেখানে জায়গা পায়। ফিফার মতে, এটি হলো 'ফুটবল খেলাটির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কারে সরাসরি ইতিহাস খোদাই করার একটি উপায়।' প্রতিটি আসর শেষে ভিত্তির নিচের দিকের ডিস্কটি বদলে নতুন বিজয়ীর নাম যুক্ত করা হয়।
আসল ট্রফি বনাম রেপ্লিকা: কড়া নিরাপত্তা
২০০৫ সাল পর্যন্ত নিয়ম ছিল, চ্যাম্পিয়ন দেশ পরবর্তী বিশ্বকাপ পর্যন্ত আসল ট্রফিটি নিজেদের কাছে রাখতে পারত। ২০০৬ সাল থেকে নিরাপত্তার খাতিরে ফুটবলের শীর্ষ সংস্থা ফিফা এই নিয়ম বদলে ফেলে। এখন ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে আসল ট্রফিটি ক্ষণিকের জন্য দেওয়া হলেও উদযাপনের পরপরই ফিফার কর্মীরা তা ফিরিয়ে নেন। এর বদলে বিজয়ী দেশকে দেওয়া হয় ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ উইনার্স ট্রফি’ নামের একটি ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া রেপ্লিকা।
আসল ট্রফিটি চিরস্থায়ীভাবে সুইজারল্যান্ডের জুরিখের ফিফা ওয়ার্ল্ড ফুটবল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত থাকে। এটি কেবল ট্রফি ট্যুর কিংবা ড্র অনুষ্ঠান কিংবা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ও ফাইনাল ম্যাচের মতো বিশেষ মুহূর্তেই বাইরে আনা হয়।
ট্রফি ছোঁয়ার অধিকার ও আকাশচুম্বী মূল্য
ফুটবল বিশ্বের পবিত্র এই সম্পদটি সবাই ছুঁতে পারেন না। ফিফার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বকাপ জয়ী খেলোয়াড়দেরই আসল ট্রফিটি হাত দিয়ে স্পর্শ করার অধিকার রয়েছে। তবে ব্যতিক্রমও আছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার হাতে একটি অফিসিয়াল রেপ্লিকা তুলে দেওয়া হয়েছিল। আজ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি খেলোয়াড় বা রাষ্ট্রপ্রধান না হয়েও এই বিরল সম্মান পেয়েছেন।
যদি কখনও ট্রফিটি নিলামে ওঠে, তবে এর দাম হতে পারে ২ কোটি ডলারেরও বেশি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪০ কোটি টাকা)। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্পোর্টস ট্রফিতে পরিণত হয়েছে।
পরিসংখ্যানের পাতায় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই
১৯৭৪ সাল থেকে নতুন ট্রফিটি সবচেয়ে বেশিবার জিতেছে জার্মানি ও আর্জেন্টিনা (তিনবার করে)। গাজ্জানিগার গড়া এই ট্রফিটি এখন পর্যন্ত ইউরোপিয়ান দেশগুলো জিতেছে আটবার এবং দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো জিতেছে পাঁচবার। তবে 'জুলে রিমে' ট্রফির মতো তিনবার জিতলে এটি চিরতরে কাউকে দিয়ে দেওয়ার নিয়ম ফিফা রাখেনি। অন্যথায় জার্মানি এতদিনে এটি চিরতরে পেয়ে যেত। তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। আর আর্জেন্টিনা ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও সবশেষ ২০২২ সালে বিশ্বসেরার মর্যাদা অর্জন করে।
গাজ্জানিগা এই ট্রফি তৈরির জন্য সরাসরি কোনো আর্থিক মুনাফা পাননি। তবে তার ছেলে জর্জিওর মতে, এর বিনিময়ে তিনি বিপুল খ্যাতি ও অন্যান্য ট্রফি বানানোর কাজ পেয়েছিলেন। উয়েফা ইউরোপা লিগ ও উয়েফা সুপার কাপের ট্রফিও গাজ্জানিগার নকশা করা।
২০১৬ সালে পরলোকগমন করেন গাজ্জানিগা। তবে তার অমর সৃষ্টি ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি খেলোয়াড়ের আজন্ম লালিত স্বপ্ন হয়ে সদা দেদীপ্যমান।