৭০ দিন বাকি

ব্রাজিলীয় জাদুকর বনাম ইংলিশ প্রহরী: ৪২ গজের মায়াবী বক্ররেখা

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

দূরত্ব সব সময়ই গোলরক্ষকদের জন্য এক পরম আশ্রয়ের নাম।

৪২ গজ!

ফুটবলের অলিখিত ব্যাকরণে এই দূরত্বটুকু হলো এক দুর্ভেদ্য দুর্গ, যেখানে দাঁড়িয়ে একজন গোলরক্ষক প্রশান্তির শ্বাস নেন। সেখান থেকে উড়ে আসা বলগুলো সাধারণত নিছকই এক রুটিন কাজ, গ্লাভসের উষ্ণতায় বন্দী হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কোনো নিরীহ শিকার।

কিন্তু ২০০২ সালের সেই সূর্যস্নাত শিজুওকায়, প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালে সেই পরম আশ্রয়টুকুই পরিণত হলো ডেভিড সিম্যানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিতে। বাতাস যেন সেদিন অদৃশ্যে হাত মিলিয়েছিল এক ব্রাজিলীয় জাদুকরের সাথে। রোনালদিনহোর ডান পা থেকে ছিটকে বের হওয়া এক মোহময়ী মরীচিকা, যা দূরত্বের স্বস্তি ভেঙে দিয়ে, এক কিংবদন্তি প্রহরীর আজীবনের সঞ্চিত আত্মবিশ্বাসকে মুহূর্তের মাঝে পরিণত করেছিল এক চিরস্থায়ী হাহাকারে। নিরাপদ ভেবে যে জায়গাটিতে সিম্যান দাঁড়িয়ে ছিলেন, কে জানতো, ঠিক সেখান থেকেই রচিত হবে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ নির্মমতম ট্র্যাজেডির প্রথম অধ্যায়!

২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।

উত্তপ্ত সূর্যালোকে স্নায়ুর চরম পরীক্ষা দিচ্ছে দুই পরাশক্তি ইংল্যান্ড ও ব্রাজিল। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির, দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের মুখোমুখি সংঘর্ষ। একদিকে শৃঙ্খল, শক্তি আর কৌশলের ইউরোপীয় বাস্তবতা; অন্যদিকে ছন্দ, কল্পনা আর জাদুর লাতিন আমেরিকান আবেগ। লড়াই চলছিল দুই দর্শনের।

প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। গোল করেন মাইকেল ওয়েন। এক ঝলকে, এক তীক্ষ্ণ আঘাতে। ব্রাজিলের রক্ষণ তখন মুহূর্তের জন্য অসতর্ক, আর সেই ফাঁক গলে বল জালে। গোলের পর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের চোখে ছিল দৃঢ়তা, তারা যেন জানত, এই ম্যাচ তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু ব্রাজিল কখনোই শুধু পরিকল্পনার দল নয়, তারা বিস্ময়ের দল। আর সেই বিস্ময়ের কেন্দ্রে ছিলেন এক চিরহাস্যময় শিল্পী রোনালদিনহো।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে রোনালদিনহো সমতায় ফেরালেন ব্রাজিলকে। অবশ্য সরাসরি নয়। তার পাস থেকে গোল করেন রিভালদো, যেন এক নিখুঁত সুরে বাঁধা সঙ্গীতের প্রথম অংশ। কিন্তু আসল সিম্ফনি বাকি তখনও।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আসে সেই মুহূর্ত, যা ইতিহাসকে নতুন করে লিখে দেয়। ব্রাজিল পায় একটি ফ্রি-কিক। দূরত্ব প্রায় ৪২ গজ। এমন দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেউ সরাসরি গোলের কথা ভাবে না। সাধারণ নিয়ম বলে, বলটি বক্সে তুলে দিতে হয়, হেডের জন্য, অথবা কোনো ডিফ্লেকশনের আশায়। কিন্তু সব নিয়মই তো ভাঙার জন্য, আর রোনালদিনহো ছিলেন সেই নিয়মভঙ্গের কবি।

বলটি স্থির। চারপাশে উত্তেজনা জমাট বাঁধছে। ইংল্যান্ডের গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন অভিজ্ঞ, নির্ভরযোগ্য, শান্ত স্বভাবের গোলরক্ষক সিম্যান। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা এক পোড়খাওয়া সেনাপতি। তার অবস্থান সামান্য এগিয়ে, কারণ তিনি অনুমান করছেন, বলটি ক্রস হয়ে আসবে। তার চোখে হিসাব, মাথায় অভিজ্ঞতার ভার, কিন্তু ফুটবল তো সবসময় হিসাব মেনে চলে না।

রোনালদিনহো পেছনে কয়েক কদম সরে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি ছিল স্থির, ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। যেন তিনি একাই জানেন, এই মুহূর্তে কী ঘটতে যাচ্ছে। তিনি দৌড়ালেন না, ঝড়ের মতো আসেননি, বরং এক শিল্পীর মতো ধীরে, নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন। তারপর তার ডান পা ছুঁয়ে দিল বলটিকে।

সেই স্পর্শে যেন সময় থেমে গেল।

বলটি আকাশে উঠতে শুরু করল। প্রথমে ধীরে, তারপর এক অদ্ভুত বাঁকে উপরের দিকে উঠতে উঠতে যেন সূর্যের দিকে হাত বাড়াল। স্টেডিয়ামের হাজারো চোখ তখন বলটির পেছনে ছুটছে। মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, এটা হয়তো অনেক বেশি উঁচুতে উঠে গেছে, গোলপোস্টের অনেক ওপরে চলে যাবে। কিন্তু ঠিক তখনই, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নামাল।

বলটি হঠাৎ নিচের দিকে বাঁক নিল। এক নিখুঁত, প্রায় অসম্ভব কার্ভ নিয়ে।

সিম্যানের চোখের মণিতে তখন রাজ্যের বিস্ময়। মুহূর্তের ভগ্নাংশে তিনি বুঝতে পারলেন, কী ভয়ংকর এক জাদুকরী ফাঁদে তিনি পা দিয়েছেন। তার নিজের এগিয়ে আসার সামান্যতম ভুলটুকু ওই ব্রাজিলিয়ান তরুণ কীভাবে পড়ে ফেলল, তা ভাবার সময় তখন নেই। অভিজ্ঞ গোলরক্ষকের মস্তিষ্কে তখন বিপদের সাইরেন বাজছে। তার শিরায় শিরায় বইতে শুরু করল আতঙ্কের হিমস্রোত। তিনি মরিয়া হয়ে পেছনের দিকে ছুটতে লাগলেন। তার সেই পেছনের দিকে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য যেন এক পরাজিত সম্রাটের সিংহাসন হারানোর করুণ আখ্যান। শরীরটাকে তিনি শূন্যে ছুঁড়ে দিলেন চূড়ান্ত এক আক্ষেপে। তার প্রসারিত দুই হাত যেন বাতাসের শূন্যতা আঁকড়ে ধরে আটকাতে চাইল এক অনিবার্য পতনকে।

স্টেডিয়াম এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ।

তারপর বিস্ফোরণ।

ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের উল্লাসে আকাশ কেঁপে উঠল, আর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা দাঁড়িয়ে রইল স্তব্ধ হয়ে।

আর সিম্যান?

বলের সাথে সাথে তিনি নিজেও যেন আছড়ে পড়লেন জালের ভেতর। সেখানে, সেই জালের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে তিনি মুখ ঘুরিয়ে দেখলেন তার নিজেরই রচিত ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্য। ঘাসের ওপর বসে, পেছনের দিকে তাকানো তার চোখেমুখে তখন এক বুক হাহাকার, এক নিদারুণ শূন্যতা আর বোবা আর্তনাদ। তার সেই বিহ্বল ও বেদনার্ত দৃষ্টি যেন ফিসফিস করে বলছিল, 'এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না!'

অন্যদিকে রোনালদিনহো দৌড়ে যাচ্ছেন, দুই হাত ছড়িয়ে, মুখে সেই চিরচেনা হাসি। যেন তিনি কোনো গোল করেননি, একটি স্বপ্ন এঁকেছেন।

গোলটি নিয়ে অনেকেই বিতর্কে মাতেন। কেউ বলেন, এটি ছিল পরিকল্পিত। তিনি সিম্যানকে এগিয়ে দেখে সরাসরি শট নিয়েছিলেন। আবার কেউ বলেন, এটি ছিল একটি ভুল ক্রস, যা ভাগ্যের সহায়তায় গোল হয়ে যায়। কিন্তু সত্যটা হয়তো এই দুইয়ের মাঝখানে কোথাও। যেখানে দক্ষতা, কল্পনা আর সামান্য সৌভাগ্য একসাথে মিশে যায়।

সেই ম্যাচে ব্রাজিল জিতে যায়। পরে তারা বিশ্বকাপও জয় করে। কিন্তু সেই পুরো যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত হিসেবে থেকে যায় এই এক গোল। কারণ এটি শুধু একটি স্কোরলাইন নয়, এটি এক অনুভূতি, এক বিস্ময়, এক শিল্পকর্ম।