৬২ দিন বাকি

‘সেভিয়ার কসাই’: সবুজ ঘাসে রক্তমাখা ট্র্যাজেডি

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

মুহূর্তটা যেন প্রথমে বোঝাই যায়নি। এটা কি সত্যিই ফুটবল মাঠ, নাকি কোনো যুদ্ধক্ষেত্র? এক টুকরো সবুজ ঘাসের ওপর হঠাৎ করে জমাট বেঁধে গেল নীরবতা, তারপর বিস্ফোরিত হলো আতঙ্ক, ক্ষোভ আর অবিশ্বাসে। হাজারো চোখের সামনে এক মানুষ নিথর হয়ে পড়ে আছে, আর আরেকজন দাঁড়িয়ে, অস্বাভাবিকভাবে নির্বিকার।

সেই দৃশ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ, ফ্রান্সের শিল্পমনা মিডফিল্ডার প্যাট্রিক বাতিস্তঁ এবং পশ্চিম জার্মানির কঠোর, প্রায় নির্মম গোলরক্ষক হেরাল্ড শুমাকার। তাদের সংঘর্ষ ছিল না কেবল বলের জন্য; সেটি হয়ে উঠেছিল মানবিকতার এক কঠিন পরীক্ষা। এক হিমশীতল আতঙ্কের স্মৃতি।

স্পেনের সেভিয়া শহর, এস্তাদিও র‍্যামন সানচেজ পিজুয়ান স্টেডিয়াম। দিনটি ছিল ১৯৮২ সালের ৮ জুলাই।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মহারণ; যেখানে মুখোমুখি দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের ফুটবল। একদিকে ফরাসিদের তুলির আঁচড়ের মতো নিপুণ, কাব্যিক ফুটবল, যার প্রাণভোমরা মিশেল প্লাতিনি। অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানির ইস্পাতকঠিন, যান্ত্রিক আগ্রাসন।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের বাতাস যেন আরো ভারী হয়ে উঠল। ফরাসি কোচ মিশেল হিডালগো মাঠে নামালেন তরুণ বাতিস্তঁকে। তার চোখেমুখে তখন বিশ্বজয়ের সোনালি স্বপ্ন। কে জানত, সেই স্বপ্ন কিছুক্ষণ পরই তলিয়ে যাবে এক অন্ধকার গহ্বরে!

খেলার বয়স তখন ৫৬ বা ৫৭ মিনিট। মাঝমাঠে বল পেলেন ফরাসি সেনাপতি মিশেল প্লাতিনি। মুহূর্তের জন্য মাথা তুলে দেখলেন মাঠের নকশা, তারপর তার পা থেকে বেরিয়ে এল এক ঐশ্বরিক থ্রু পাস। বলটি যেন শূন্যে ভাসমান এক রূপকথার পাখি, যা জার্মান রক্ষণভাগের সমস্ত ব্যূহ ভেদ করে নিখুঁতভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেই মায়াবী বলের পিছু পিছু চিতার ক্ষিপ্রতায় ছুটতে শুরু করলেন বাতিস্তঁ। তার সামনে এখন কেবল উন্মুক্ত গোলপোস্ট, আর জার্মান গোলরক্ষক শুমাকার।

শুমাকার তার গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু তার দৌড়ের ধরনে বল বাঁচানোর কোনো আকুতি ছিল না, ছিল এক শিকারির আদিম ক্রূরতা। বাতিস্তঁ ততক্ষণে বলের নাগালে পৌঁছে গেছেন, আলতো টোকায় সেটিকে জালের দিকে পাঠিয়েও দিয়েছেন। ঠিক সেই পরম মুহূর্তে, যখন বাতিস্তঁর শরীর শূন্যে ভাসমান, শুমাকার তার পুরো শরীরের ভর নিয়ে আছড়ে পড়লেন ফরাসি তরুণের ওপর। কোনো স্লাইড ট্যাকল নয়, বলের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নয়; এটি ছিল কেবলই এক মানব-ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসলীলা। শুমাকারের নিতম্ব এবং কনুই সজোরে আঘাত করল বাতিস্তঁর মুখে।

একটি শব্দ। হাড়ের, মাংসের, সংঘর্ষের। তারপর নিস্তব্ধতা।

হ্যাঁ, আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করা সেই বিকট শব্দ আছড়ে পড়ল সেভিয়ার গ্যালারিতে। যেন কোনো ভারী হাতুড়ির ঘায়ে ভেঙে পড়ল কাঁচের দেয়াল। বাতিস্তঁ ছিটকে পড়লেন মাটিতে। তার শরীরটা দুমড়ে-মুচড়ে ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ল, ঠিক যেন ডানা ভাঙা এক মৃত পাখি। গ্যালারির কোলাহল যেন মুহূর্তে শুষে নিল কোনো এক অদৃশ্য ব্ল্যাকহোল। পুরো স্টেডিয়ামে নেমে এল এক শ্মশানের নীরবতা।

বাতিস্তঁ মাটিতে পড়ে রইলেন, যেন প্রাণহীন। তার চোখ বন্ধ, শরীর নিস্পন্দ, মুখে রক্তের রেখা। তার জার্সির সাদা রঙ যেন হঠাৎ করে হয়ে উঠল আতঙ্কের প্রতীক। কেউ কেউ পরে বলেছিলেন, সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, এটা আর খেলা নয়, এটা যেন মৃত্যুর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষকে দেখা।

মাঠে তখন এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। প্লাতিনি উন্মাদের মতো ছুটে গেলেন তার সতীর্থের কাছে। বাতিস্তঁর মুখ ফ্যাকাশে, স্পন্দন প্রায় নেই বললেই চলে, আর ঠোঁটের কোণ দিয়ে বেরিয়ে আসছে গ্যাঁজলা। প্লাতিনি পরে শিহরিত হয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন বাতিস্তঁ হয়তো আর বেঁচেই নেই। মেডিকেল দল যখন স্ট্রেচারে করে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন তার একটি নিথর হাত স্ট্রেচারের বাইরে ঝুলে ছিল। সেই দৃশ্যটি যেন ছিল এক পরাজিত, মুমূর্ষু যোদ্ধার করুণ বিদায়। তার তিনটি দাঁত ভেঙে গিয়েছিল, চোয়াল চুরমার হয়ে গিয়েছিল এবং মেরুদণ্ডের কশেরুকাও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাতিস্তঁ তলিয়ে গিয়েছিলেন গভীর কোমায়।

কিন্তু এই নারকীয় তাণ্ডবের পরও যখন পুরো বিশ্ব বিচারের আশায় ডাচ রেফারি চার্লস করভারের দিকে তাকিয়ে, তখন তিনি যা করলেন তা ফুটবলের ইতিহাসের আরেক চরম ট্র্যাজেডি। তার বাঁশিতে কোনো ফাউল বাজল না, লাল কার্ড তো বহুদূরের কথা! তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নির্দেশ দিলেন গোলকিকের। একটি খুন হয়ে যাওয়া মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আইনের এই অন্ধত্ব ফরাসি খেলোয়াড়দের স্তব্ধ করে দিল।

আর সেই সময়ে শুমাকার? রেফারির অবিচারের চেয়েও বহুগুণ ভয়ংকর ছিল তার শরীরী ভাষা। মাঠের এক প্রান্তে যখন একটি জীবন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, শুমাকার তখন গোলপোস্টে হেলান দিয়ে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে চুইংগাম চিবোচ্ছিলেন। তার চোখেমুখে অনুশোচনার কোনো ছায়া তো ছিলই না, উল্টো ছিল এক চরম ঔদ্ধত্য। তিনি যেন অপেক্ষা করছিলেন কখন এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতি শেষ হবে এবং তিনি আবার খেলা শুরু করবেন। তার সেই হিমশীতল চাহনি আর চুইংগাম চিবোনোর দৃশ্যটি ছিল মানবিকতার গালে এক সশব্দ চপেটাঘাত।

জার্মানি শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি টাইব্রেকারে জিতেছিল, কিন্তু শুমাকার হেরে গিয়েছিলেন মানবতার কাঠগড়ায়। ফরাসি সংবাদমাধ্যম তাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘সেভিয়ার কসাই’ নামে। ম্যাচ শেষে যখন সাংবাদিকরা তাকে বাতিস্তঁর ভেঙে যাওয়া দাঁত ও চোয়ালের কথা মনে করিয়ে দেয়, তখন তার সেই দম্ভোক্তি বিশ্ববাসীকে আরেকবার শিউরে তুলেছিল। তিনি অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলেছিলেন, 'যদি তার কেবল দাঁত ভেঙে থাকে, তবে আমি তাকে জ্যাকেট বা দাঁতের ক্রাউন পরিয়ে দেওয়ার খরচ দিয়ে দেব।'

অবশ্য অনেক বছর পর এসে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন শুমাকার। কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে, যা ক্ষমার বাইরে থেকে যায়। কারণ সেগুলো শুধু শরীরে আঘাত করে না, আঘাত করে বিশ্বাসে।