৫৮ দিন বাকি

তারদেল্লির চিৎকার

মানুষ কখন কাঁদে? যখন হারায়, নাকি যখন পায়?

হয়তো দু’ক্ষেত্রেই। কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে প্রাপ্তির আনন্দ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে তা চোখের জলের ভাষা ধার করে। সেই অশ্রু তখন দুঃখের নয়, বরং এক জীবনের সমস্ত লড়াইয়ের সাক্ষ্য। এমন এক মুহূর্তই জন্ম দিয়েছিল এক চিৎকার। যা শব্দ নয়, ইতিহাস।

১৯৮২ সালের সেই গ্রীষ্মে, ফুটবল মাঠে পৃথিবী শুনেছিল এমন শব্দ।

মানুষের ভিতরে কিছু শব্দ থাকে যেগুলো মুখে বলা যায় না, কেবল জমে থাকে। বছর পেরোয়, সময় বদলায়, কিন্তু সেই শব্দগুলো বুকের গভীরে স্তরে স্তরে জমাট বাঁধে। আর হঠাৎ কোনো এক মুহূর্তে, কোনো এক বিস্ফোরণে, তারা সব একসাথে বেরিয়ে আসে। অসংলগ্ন, অসংযত, অথচ নিখাদ সত্য হয়ে।

স্পেনের আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। গ্যালারিতে ঢেউ তুলছে হাজারো মানুষের কণ্ঠ, অথচ মাঠের ভেতরে সময় যেন অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনায় জমাট। একদিকে পশ্চিম জার্মানির লৌহকঠিন স্নায়ু, নিখুঁত জার্মান যন্ত্রাংশের মতো তাদের আক্রমণ; আর অন্যদিকে ইতালির রোমান্টিসিজম, শিল্প আর আবেগের এক অনবদ্য যুগলবন্দী।

টুর্নামেন্টের শুরুতে ধুঁকতে থাকা সেই আজ্জুরিরাই পাওলো রসি নামের এক জাদুকরের কাঁধে চড়ে ফাইনালে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পরম আরাধ্য সেই সোনালী ট্রফিটার গায়ে চুমু আঁকতে হলে পেরোতে হবে এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর। আর সেই প্রাচীর ভাঙার চূড়ান্ত আঘাতটি হানার জন্য মাঝমাঠ থেকে এক অক্লান্ত যোদ্ধা তখন নিজেকে প্রস্তুত করছেন, তিনি মার্কো তারদেল্লি।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৬৯ মিনিট।

ইতালি এগিয়ে, কিন্তু জার্মানদের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে 'এগিয়ে থাকা' কখনোই নিশ্চিন্ত নয়। প্রতিটি পাস, প্রতিটি স্পর্শ যেন একেকটা হিসেবি পদক্ষেপ। এক ভুলেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে।

তখনই ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার গায়েতানো স্কিরিয়া হঠাৎ করেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন প্রতিপক্ষের সীমানায়। ডি-বক্সের ঠিক বাইরে বলটা যখন তারদেল্লির পায়ে পৌঁছাল, তখন চারপাশের বাতাস যেন স্থির হয়ে গেছে। গায়ে জার্মান ডিফেন্ডারদের তপ্ত নিঃশ্বাস, এক চুল ভুল হলেই সব শেষ। কিন্তু সেই ভগ্নাংশ সেকেন্ডে তারদেল্লি যেন জাগতিক সমস্ত হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে। বিদ্যুৎগতিতে বলটা নিজের আয়ত্তে নিলেন, শরীরটাকে সামান্য বাঁকিয়ে বাঁ পায়ের এক দুর্ধর্ষ, সপাটে ভলি। বলটা বাতাস কেটে, জার্মান গোলরক্ষক টনি শুমাখারকে নিছক এক দর্শক বানিয়ে আছড়ে পড়ল জালের ঠিক ডানদিকের কোণায়।

এরপরের কয়েকটা মুহূর্ত পৃথিবীর ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে কাব্যিক দৃশ্যগুলোর একটি।

গোল করার পর তারদেল্লির শরীরী ভাষা এক নিমিষে পাল্টে গেল। তিনি ভুলে গেলেন এটা শতাব্দীর অন্যতম সেরা এক মহারণ, ভুলে গেলেন গ্যালারিতে থাকা লাখো দর্শকের গগনবিদারী কোলাহল আর স্পেনের রাজার রাজকীয় উপস্থিতি। সতীর্থদের আলিঙ্গন এড়িয়ে তিনি ছুটতে শুরু করলেন ইতালির ডাগআউটের দিকে। তার সেই পাগলাটে দৌড়, সেই হুংকার, ইতিহাসে যা চিরকালের জন্য ‘তারদেল্লির চিৎকার’ বা ‘L'urlo di Tardelli’ নামে অমর হয়ে আছে।

এই চিৎকার তো কেবল চামড়ার একটা গোলককে জালে জড়ানোর উদযাপন ছিল না। এই চিৎকারের ভেতর লুকিয়ে ছিল তোসকানা অঞ্চলের কারেজিনে নামের এক ছোট্ট, পাহাড়তলি গ্রামের দরিদ্র ঘরের ছেলের বিশ্বজয়ের না বলা গল্প। যে ছেলেটি ছোটবেলায় খালি পায়ে ধুলোমাখা মাঠে ফুটবল খেলত, যাকে তার বাবা বারবার বলেছিল, 'ফুটবল খেলে জীবনে কখনো পেট ভরবে না, বরং কোনো কাজে লেগে পড়'; সেই ছেলেটিই আজ বিশ্বমঞ্চের অবিসংবাদিত রাজা। তারদেল্লির ওই গগনবিদারী চিৎকারে মিশে ছিল জীবনের সমস্ত বঞ্চনা, প্রত্যাখ্যান, আর স্বপ্নের পেছনে অবিরাম ছুটে চলার এক মহাজাগতিক অবসান।

দৌড়াতে দৌড়াতে তারদেল্লির সেই মুষ্টিবদ্ধ হাত যেন শূন্যে ঘুষি মেরে চুরমার করে দিচ্ছিল অতীতের সমস্ত না পাওয়াকে। চোখের সেই জল কেবল আনন্দের ছিল না; তা ছিল দীর্ঘ বছরের জমানো অভিমানের গলিত লাভা। যৌবনের শুরুতে পিজ্জা ডেলিভারি দেওয়া থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ করা, প্রতিটি ঘামের ফোঁটা যেন ওই এক দৌড়ে পূর্ণতা পাচ্ছিল। এক লহমায় জীবনের সব হিসাব চুকে গেল।

তিনি কাঁদছিলেন, হাসছিলেন, চিৎকার করছিলেন, যেন নিজের আত্মাকে নিংড়ে বের করে আনছিলেন বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায়।