প্রাচীরের নাম হাওয়ার্ড
যুদ্ধেরও একটি ছন্দ থাকে। কখনও দ্রুত, কখনও ধীর, কখনও নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেওয়া এক উত্তেজনা। কিন্তু কিছু কিছু লড়াই আছে, যেখানে ছন্দ বলে কিছু থাকে না; থাকে শুধু একটানা আক্রমণ আর তার বিপরীতে এক অদম্য প্রতিরোধ। সেই বিকেলে, ফুটবলের সব ছন্দ যেন ভেঙে গিয়েছিল, আর একাই তার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন টিম হাওয়ার্ড। মানুষ নাকি প্রাচীর, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সময়টা ২০১৪ সালের ১ জুলাই।
ব্রাজিলের সালভাদরের এরিনা ফনতে নোভা স্টেডিয়াম তখন এক অসম যুদ্ধের মঞ্চ। একদিকে এডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুইনা, ভিনসেন্ট কোম্পানিদের নিয়ে গড়া বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম, যাদের পায়ে ফুটবলের জাদুকরী ছন্দ। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যাদের সম্বল কেবল হার না মানা মানসিকতা। কিন্তু সেদিন সবুজ গালিচায় যে মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি লেখা হতে যাচ্ছে, গ্যালারির লক্ষাধিক দর্শক তার বিন্দুমাত্র আঁচও করতে পারেননি।
রেফারির প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই শুরু হলো একপেশে তাণ্ডব। বেলজিয়ামের আক্রমণভাগ যেন রণক্ষেত্রকে নিজেদের মর্জিমাফিক সাজিয়ে নিল। বক্সের ভেতর থেকে, বাইরে থেকে, ডান প্রান্ত কিংবা বাঁ প্রান্ত থেকে, একের পর এক গোলা ধেয়ে আসতে লাগল মার্কিন শিবিরের দিকে। নিঁখুত জ্যামিতিক পাস আর ক্ষিপ্র গতির দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগ তখন যেন প্রবল ঝড়ের কবলে পড়া এক জীর্ণ পালতোলা নৌকা।
প্রথম বড় শটটা আসে হঠাৎ করেই। দূর থেকে জোরালো আঘাত। বলের গতিপথ ছিল নির্ভুল, শক্তি ছিল যথেষ্ট। গোল হওয়ার কথা। কিন্তু হাওয়ার্ডের দুই হাত যেন সময়ের চেয়েও দ্রুত। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন, বলটাকে সরিয়ে দিলেন, যেন সেটা কোনো বিপদই নয়। সেই এক মুহূর্তেই বোঝা গেল, আজকের দিনটা অন্যরকম।
তারপর শুরু হলো এক অন্তহীন আক্রমণের গল্প। বাঁ দিক দিয়ে ঢুকে পড়ছেন হ্যাজার্ড, তার ড্রিবলিংয়ে ছিটকে যাচ্ছেন ডিফেন্ডাররা। ডি ব্রুইনা মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত পাস ছুঁড়ে দিচ্ছেন, যেন দাবার বোর্ডে গুটি সাজাচ্ছেন। আর সামনে রোমেলু লুকাকু। শক্তি আর গতির এক মিশ্রণ, যে কোনো মুহূর্তে গোলের দ্বার খুলে দিতে পারে।
প্রতিটি আক্রমণই ছিল আলাদা গল্প। কখনও নিচু শট, কখনও হেড, কখনও হঠাৎ ভলি, প্রতিটি বলই গোলমুখে এসে যেন দাবি জানাচ্ছিল, 'আমাকে ঢুকতে দাও।' কিন্তু প্রতিবারই, সেই দাবিকে অস্বীকার করছিলেন একজন মানুষ।
হাওয়ার্ডের শরীর তখন শুধু শরীর ছিল না, সেটা ছিল প্রতিক্রিয়ার এক বিস্ময়কর যন্ত্র। বল আসার আগেই যেন তিনি বুঝে ফেলতেন তার গন্তব্য। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতের ডগায় ঠেকানো, বাঁদিকে পড়ে গিয়ে পা বাড়িয়ে ব্লক করা, কখনও একেবারে কাছে থেকে শট আসার পরও ঠান্ডা মাথায় সেটা ফিরিয়ে দেওয়া, প্রতিটি সেভ যেন অসম্ভবের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিল।
দর্শকরা প্রথমে হাততালি দিচ্ছিল, তারপর বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে অবিশ্বাস, 'আরেকটা সেভ! আবার হাওয়ার্ড!' এই শব্দগুলো যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো স্টেডিয়াম একটাই প্রশ্ন করছে, একজন মানুষ কতবার এইভাবে বাঁচাতে পারে?
সময় যত এগোচ্ছিল, ততই এই লড়াই ব্যক্তিগত হয়ে উঠছিল। এটা আর শুধু বিশ্বকাপের একটি নকআউট ম্যাচ ছিল না; এটা ছিল একজন গোলরক্ষকের বিরুদ্ধে পুরো একটি আক্রমণভাগের যুদ্ধ। প্রতিটি সেভের পর তার চোখে আরও তীক্ষ্ণতা, আরও জেদ দেখা যাচ্ছিল, যেন তিনি নিজেকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন, 'আরও পারো কি?'
নব্বই মিনিট পেরিয়ে যায়। স্কোরলাইন তখনও অচল, যেন সময়কেও আটকে রেখেছেন হাওয়ার্ড।
কিন্তু ফুটবল, শেষ পর্যন্ত, মানুষের তৈরি এক খেলা। এখানে অলৌকিকতাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত সময়ে, অবশেষে সেই প্রাচীরে ফাটল ধরে। একের পর এক আক্রমণের পর ডি ব্রুইনা বল জালে পাঠান। তারপর লুকাকু। তার শক্তির সামনে আর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। স্কোরলাইন বদলে যায়, বাস্তবতা ফিরে আসে।
তবুও, সেই মুহূর্তেও হাওয়ার্ডের চোখে কোনো ভাঙন ছিল না। তিনি উঠে দাঁড়ান, আবার প্রস্তুত হন, যেন যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। কারণ তার লড়াই ছিল ফলাফলের জন্য নয়; তার লড়াই ছিল নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য।
শেষ বাঁশি বাজে। স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে এক ফলাফল, কিন্তু মানুষের মনে লেখা থাকে আরেক গল্প। ১৬টি সেভ। একটি সংখ্যা, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অগণিত মুহূর্ত, অগণিত শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য, অগণিত অসম্ভবকে অস্বীকার করার কাহিনী।