প্যারেন্টিং

ব্যস্ত জীবনে সন্তানের প্রতি আরও মনোযোগী হবেন যেভাবে

রবিউল কমল
রবিউল কমল

সকালে সন্তানকে স্কুলের জন্য তৈরি করা, নাশতা খাওয়ানো, স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, এরপর নিজের কাজ সামলানো; এভাবে দিনের বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় নানা ব্যস্ততায়। বিকেলে পড়ালেখা, খেলাধুলা, ঘরের কাজ; সব মিলিয়ে সন্তানের সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় কোথায়? একই ঘরে থেকেও অনেক সময় একে অন্যকে সময় দেওয়া হয় না।

কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়তে প্রতিদিন অনেকটা সময় বরাদ্দ রাখতেই হবে, এমন নয়। বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাস সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে।

জেনে নেওয়া যাক, ব্যস্ততার মধ্যেও কীভাবে সন্তানের জন্য আরও মনোযোগী হওয়া যায়।

কথা দিলে কথা রাখা

সন্তান হয়তো খেলতে চাইছে, কিন্তু অভিভাবক ব্যস্ত। এমন সময় অনেকেই বলেন, ‘একটু পরে খেলব।’ কিন্তু সেই একটু পরে আর আসে না। এভাবে বারবার অপেক্ষা করতে করতে সন্তান হতাশ হতে পারে।

ইউনিসেফের চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট দীপু মাহমুদ বলেন, কখন সময় দেওয়া সম্ভব, তা স্পষ্ট করে বলা ভালো। যেমন, ‘এখন রান্নাটা শেষ করি, তারপর তোমার সঙ্গে খেলব।’ সম্ভব হলে নির্দিষ্ট সময়ও জানিয়ে দেওয়া যায়। কথা দিলে তা রাখার চেষ্টা করতে হবে। এতে সন্তান বুঝতে শিখবে, তার চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানের সঙ্গে থাকলে মনোযোগ দেওয়া

সন্তান পাশে বসে গল্প করছে, আর অভিভাবক ফোনে ব্যস্ত; এমন দৃশ্য অনেক পরিবারেই দেখা যায়। একই জায়গায় থাকলেই যে একসঙ্গে সময় কাটানো হয়, তা নয়।

দীপু মাহমুদের পরামর্শ, সন্তান কথা বলার সময় ফোন সরিয়ে রেখে তার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। তার কথা শুনতে হবে, প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সব সময় সন্তানের সঙ্গে থাকতে হবে, এমন নয়। তবে যখন তার সঙ্গে থাকা হবে, তখন যথাসম্ভব মনোযোগী থাকা প্রয়োজন।

একসঙ্গে আনন্দের সময় কাটানো

সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য সব সময় বাইরে বেড়াতে যাওয়া বা দামি খেলনা কেনার প্রয়োজন নেই। ছাদে হাঁটাহাঁটি, বারান্দায় গাছের যত্ন নেওয়া, লুডু খেলা, ছবি আঁকা কিংবা একসঙ্গে গল্পের বই পড়াও হতে পারে আনন্দের উপলক্ষ।

সপ্তাহের কোনো একটি দিন পরিবারের সবাই মিলে কিছু করার পরিকল্পনা করা যায়। ব্যস্ততার মধ্যেও এই সময়টুকু ধরে রাখার চেষ্টা করা জরুরি।

কিছু সময়ের জন্য ফোন দূরে রাখা

মোবাইল ফোন এখন কাজ, যোগাযোগ ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে ফোনের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ সন্তানের সঙ্গে কথোপকথনে বাধা তৈরি করতে পারে।

দীপু মাহমুদ বলেন, খাওয়ার সময়, গল্প করার সময় কিংবা সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর আগে ফোন সরিয়ে রাখা ভালো। টেলিভিশন বন্ধ করে পরিবারের সবাই মিলে কথা বলা যায়। সন্তানের সঙ্গে রান্নার ছোটখাটো কাজ করা কিংবা ঘর গোছানোর মতো কাজেও তাকে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে কাজের পাশাপাশি একসঙ্গে সময় কাটানোও হবে।

পরিবারের কিছু নিয়মিত অভ্যাস তৈরি

শিশুরা নিয়মিত অভ্যাসের মধ্যে স্বস্তি ও নিরাপত্তা খুঁজে পায়। তাই পরিবারের সুবিধা অনুযায়ী কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

যেমন, রাতে একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করা, স্কুল থেকে ফিরে দিনের গল্প শোনা, ঘুমানোর আগে বই পড়া কিংবা সপ্তাহে এক দিন পরিবারের সবাই মিলে খেলাধুলা করা। সব পরিবারে একই নিয়ম কার্যকর হবে না। নিজেদের সময় ও সামর্থ্যের সঙ্গে মিলিয়ে রুটিন তৈরি করা এবং তা নিয়মিত অনুসরণের চেষ্টা করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন করা, মন দিয়ে শোনা

‘আজ স্কুলে কী হয়েছে?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে সন্তান হয়তো বলবে, ‘কিছু না।’ কথোপকথন সেখানেই থেমে যেতে পারে।
এর বদলে জানতে চাওয়া যায়, ‘আজ স্কুলে সবচেয়ে মজার ঘটনা কী ছিল?’ ‘টিফিনে কার সঙ্গে খেয়েছ?’ কিংবা ‘আজ কোনো কিছুতে মন খারাপ হয়েছিল?’ এমন প্রশ্ন সন্তানকে নিজের অভিজ্ঞতা খুলে বলার সুযোগ দেয়।

তবে শুধু প্রশ্ন করলেই হবে না, তার উত্তরও মন দিয়ে শুনতে হবে। সন্তান কোনো সমস্যার কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা বা উপদেশ না দিয়ে আগে তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

ঘুমানোর আগে গল্প করা

দীপু মাহমুদের ভাষ্য, দিনের শেষে ঘুমানোর আগের সময়টুকু সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার দারুণ সুযোগ। ছোটদের গল্প পড়ে শোনানো যায়। একটু বড় শিশুর সঙ্গে কথা বলা যায় তার বন্ধু, স্কুল, পছন্দ কিংবা মনের ভাবনা নিয়ে।

সন্তান চাইলে নিজের দিনের গল্প বলবে, আবার কোনো দিন হয়তো চুপচাপ থাকতে চাইবে। তাকে জোর না করে স্বাভাবিকভাবে সময় দেওয়া ভালো। প্রতিদিনের এই ছোট্ট অভ্যাস সন্তানের মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারে।

সবকিছু নিখুঁত করার চেষ্টা না করা

সন্তান প্রতিপালন সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। কোনো দিন ঘর অগোছালো থাকবে, কোনো দিন পড়া শেষ হতে দেরি হবে, আবার কোনো দিন সন্তানকে নিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু করাও সম্ভব হবে না।

দীপু মাহমুদ মনে করেন, এসব নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন সব কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করার চেয়ে সন্তানের সঙ্গে আনন্দের কিছু মুহূর্ত তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মোটকথা, সন্তানের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়তে দামি উপহার কিংবা বিশেষ আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আন্তরিকতা, মনোযোগ ও ছোট ছোট প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানের কথা শোনা, একসঙ্গে হাসা, খেলা কিংবা গল্প করার অভ্যাসই হয়ে উঠতে পারে সম্পর্কের মজবুত ভিত।