এক্সপ্লেইনার

ইরান কেন বন্ধুহীন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

শান্তি আলোচনা চলমান অবস্থায় ইরানে দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রত্যাশিত সামরিক অভিযানের মধ্যে একটি তথ্য অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।

তথ্যটি হলো: যুদ্ধ শুরুর পরের দিন তথা গত রোববার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়—‘সৌদি চাপ, ইসরায়েলি সহায়তা ট্রাম্পকে ইরান হামলায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুসারে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনই কোনো হুমকি ছিল না। কিন্তু, আঞ্চলিক মিত্রদের যুক্তি এটাই হামলার প্রকৃত সময়।

সব আন্তর্জাতিক আইনকে চরমভাবে উপেক্ষা করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর মরণ-আঘাত হেনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করেছে। খনিজসমৃদ্ধ অথচ অপেক্ষাকৃত অনেক দুর্বল এই দেশটি এখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে।

অথচ, বিপদে পাশে দাঁড়ান যিনি তিনিই তো প্রকৃত বন্ধু। সেই আলোকে বিচার করা যেতে পারে ইরানের আজকের পরিস্থিতিকে। প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ থেকেই নিজেদের প্রয়োজনে অনেক রাষ্ট্র সুবিধাজনক দামে তেল-গ্যাস নিয়েছে। 

Attack
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্যেই সড়কে নামাজ আদায় করছেন তেহরানবাসীরা। ছবি: রয়টার্স

 

অথচ, দেশটির এমন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্রকেই তেহরানের পাশে দেখা যাচ্ছে না।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়—বিশ্বের প্রথম পরাশক্তি হিসেবে খ্যাত পারস্য সাম্রাজ্যের ‘গর্বিত’ উত্তরাধিকার ইরান এখন প্রকৃত অর্থেই এক ‘বন্ধুহীন’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা হামলার পর খনিজসমৃদ্ধ ইরানের ‘বন্ধুহীনতা’ আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।

গত বছর জুনের প্রথম দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো যখন ইরানে হামলা চালিয়েছিল তখনো ইরানের ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে সুবিদিত রাশিয়া ও চীনকে তেহরানের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। এমনকি, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে কোনো শোরগোলও তুলেনি ইরানের পরাশক্তিধর ‘বন্ধু’ দেশ দুটিকে।

সে বছর ২২ জুন টাইম-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম বলেছিল—মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কিভাবে বিচ্ছিন্ন দেশে পরিণত হলো।

প্রতিবেদনে জানানো হয়—তেহরান আশা করেছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইরানকে সহায়তা করবে। কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেল সেই অঞ্চলে ইরানের সত্যিকারের কোনো বন্ধু নেই।

ইরানের সত্যিই কেন বন্ধু নেই?—এ সম্পর্কে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল: ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণের আরব এবং উত্তর-পুবের অনারব মুসলিম দেশের সরকারগুলোর সঙ্গে ইরানের দূরত্ব হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। এর মূল কারণ ধর্মীয় মতভেদ।

অন্যদিকে, তেহরানের কট্টরপন্থি শাসকদের যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো ‘শত্রু’ আখ্যা দেওয়ায় ধীরে ধীরে ইরান একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, যে গুটিকয়েক রাষ্ট্র হোয়াইট হাউসের নীতির বিরোধিতা করে, ইরানকে সেসব রাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্যতা রেখে চলতে হয়েছে।

২০১৬ সালে ইরান সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফাইল ছবি: রয়টার্স
২০১৬ সালে ইরান সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

 

পাশাপাশি, ইরানকে তার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী পররাষ্ট্রনীতির কারণে এই দুই দেশের ক্রমাগত আক্রমণ মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ-নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে ইরানকে ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

ক্ষমতাসীনদের নানান ‘নিপীড়নমূলক’ সিদ্ধান্ত মানুষকে বিক্ষুব্ধ করায় ইরানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট নানা সময়ে নষ্ট হয়েছে। বহির্বিশ্বের ইরান নিজেকে ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ মুখ’ হিসেবে প্রচার করে। আবার সেই দেশের সরকারি বাহিনীর হাতে নিরীহ বিক্ষোভকারীরা নিহত হন। এমন বাস্তবতায় ইরান আন্তর্জাতিক মহলে সহমর্মিতা হারায়।

শুধু তাই নয়—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি নিজের প্রভাব বাড়াতে ইরান প্রতিবেশী ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনের জনগণের একাংশকে নিয়ে ‘প্রতিরোধ বলয়’ নামে সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে। এসব সংগঠন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে ইরানের ক্ষমতাসীনদের ‘অনুগত’ হওয়ায় তেহরানের সরকারকে উন্নত দেশগুলো ‘সন্ত্রাসীদের মদতদাতা’ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে।

Russian president Vladimir Putin and Iranian leader Ali Khamenei meeting in 2017. Photo: the official website of Khamenei.
২০১৭ সালে 'বন্ধু' পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ফাইল ছবি: খামেনির কার্যালয় 

আবার ইরানের ‘সমর্থনপুষ্ট’ এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজ নিজ দেশে প্রথমে প্রতিরোধ যোদ্ধা ও পরে ‘অরাজকতার’ প্রতীক হয়ে ওঠে। তাদের সামরিক শক্তি নিজ নিজ দেশকে কার্যত অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে। ফলে ইরান সরকার নিজ দেশের জনগণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণের কাছেও ‘স্বৈরাচার’ তকমা পেতে থাকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভার্জিনিয়াভিত্তিক রাজনৈতিক সাময়িকী ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—পুতিনের বন্ধুত্বের একটা সীমা আছে, ইরান এইমাত্র তা বুঝতে পারলো।

প্রতিবেদনে বলা হয়—ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তেহরান থেকে মস্কোয় ফোন দেওয়া হয়েছিল। ওপাশ থেকে অর্থাৎ, মস্কো থেকে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়। সমর্থনের আশ্বাস দেওয়া হয় মৌখিকভাবে।

প্রতিবেদনটিতে রাশিয়ার অপর দুই সাবেক মিত্র সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, সেই দুই ঘটনায় বুঝে নেওয়া যায় যে মার্কিন হামলার বিপক্ষে ক্রেমলিন আসলে কী করতে পারে। এ ছাড়াও, সেই দুই দেশের সরকারের পরিণতির কথা ইরানের সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

Independence Day
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ফাইল ছবি: সংগৃহীত 

 

ইরানের এই অস্তিত্ব-সংকটে ‘বন্ধু’ চীনের ভূমিকা কী?—এ সম্পর্কে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল—আজ সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং তার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে জাতিসংঘের অনুমোদন ছিল না। এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’

iran assad Khamenei
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সঙ্গে ইরানের প্রয়াত নেতা খামেনি। ফাইল ছবি: রয়টার্স 

 

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই মুখপাত্রের প্রশ্ন-উত্তর সবিস্তার দেওয়া আছে। এর আগের দিন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘ইরানে হামলায় চীনের নিন্দা, যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার আহ্বান’।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের চাপ যখন ইরানের বিরুদ্ধে, তখন মস্কোর মতো বেইজিংকেও ‘নিন্দা’ ও ‘সহানুভূতি’র মধ্যে বন্দি থাকতে দেখা গেল।

ইরান বিশ্লেষকদের অনেকের মতে—গত ৪৭ বছরে তেহরানের বিপ্লবী সরকার পশ্চিমের চাপ প্রতিহত করে আন্তর্জাতিক মহলে কারও সঙ্গে প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারেনি।

পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ ‘অব্যবস্থাপনা’র কারণে তারা ইরানকেও একটি ‘ভঙ্গুর’ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

আর এ জন্যই হয়ত ইরান বিশ্বের প্রথম পরাশক্তি হয়েও আজ প্রকৃত অর্থেই বন্ধুহীন।